ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক স্বর্ণযুগের অবসান। কিংবদন্তি নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী এস জানকী (S. Janaki) আর নেই। ৮৮ বছর বয়সে কর্ণাটকের মহীশূরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন দক্ষিণ ভারতের ‘নাইটিঙ্গেল’ নামে পরিচিত এই বর্ষীয়ান শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত মহলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
আরও পড়ুন – Ilish Paturi : বর্ষার দুপুরে ইলিশ পাতুরি! লাঞ্চ একেবারে জমজমাট!

ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের অনন্য কণ্ঠস্বর, আবেগময় গায়কি এবং অসামান্য সুরসাধনার মাধ্যমে কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৮ সালের ২৩ এপ্রিল তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির (বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ) গুন্টুর জেলার পল্লাপাতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এস জানকী (S. Janaki)। তাঁর বাবা সিস্তলা শ্রীরামমূর্তি ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও শিক্ষক। শৈশব কেটেছে সিরসিল্লায়। মাত্র নয় বছর বয়সেই প্রথম মঞ্চে গান গেয়ে নজর কাড়েন তিনি। পাইডিস্বামী নামে এক নাদস্বরম শিল্পীর কাছে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নিলেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর প্রথাগত দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ছিল না। সহজাত প্রতিভা, নিষ্ঠা এবং অক্লান্ত সাধনাই তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীতের অন্যতম শিখরে পৌঁছে দেয়।১৯৫৭ সালে তামিল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে তাঁর পেশাদার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম বছরেই একাধিক ভাষায় গান রেকর্ড করে নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন এস জানকী (S. Janaki)। তেলুগু মাতৃভাষা হলেও তামিল, কন্নড়, মালয়ালম, হিন্দিসহ বহু ভাষায় অনর্গল গান গেয়েছেন তিনি। দীর্ঘ কেরিয়ারে প্রায় ৪৮ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করে ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে এক বিরল নজির স্থাপন করেন।

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের পাশাপাশি হিন্দি সিনেমাতেও এস জানকীর (S. Janaki) কণ্ঠ সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিংবদন্তি সুরকার ইলাইয়ারাজা, এম এস বিশ্বনাথন, এ আর রহমান, বাপ্পি লাহিড়িসহ বহু খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে এস পি বালসুব্রহ্মণ্যমের সঙ্গে তাঁর গাওয়া অসংখ্য দ্বৈত গান আজও শ্রোতাদের কাছে কালজয়ী। হিন্দি চলচ্চিত্র সাহেব-এর জনপ্রিয় গান ‘ইয়ার বিনা চ্যান কাহাঁ রে’-তেও তাঁর কণ্ঠ আজও সমানভাবে সমাদৃত।

এস জানকীর (S. Janaki) অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মোট ৩৩টি চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। তবে ২০১৩ সালে ভারত সরকারের দেওয়া পদ্মভূষণ সম্মান গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভারতীয় সঙ্গীতে দীর্ঘদিনের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত। ১৯৫৯ সালে ভি. রামপ্রসাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীর অকুণ্ঠ সমর্থন তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনের অন্যতম শক্তি ছিল। ১৯৯৭ সালে স্বামীর মৃত্যুর পরও তিনি সঙ্গীতকে সঙ্গী করেই পথ চলেছেন। ২০১৬ সালে চলচ্চিত্র এবং মঞ্চে গান গাওয়া থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে আবারও স্টুডিওতে ফিরিয়ে আনে। ২০১৮ সালে তামিল চলচ্চিত্র পান্নাডি-র জন্য শেষবারের মতো গান রেকর্ড করেন তিনি।
আরও পড়ুন – যেতে হবে না বিদেশ, অচেনা ভারতেই পর্যটনের নতুন ঠিকানা!
এস জানকীর (S. Janaki) প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল। তবে তাঁর গাওয়া হাজার হাজার গান, অমর সুর এবং অসামান্য শিল্পসাধনা তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে। সুরের সেই কোকিলকণ্ঠ হয়তো আজ স্তব্ধ, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মাধুর্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুরণিত হয়ে থাকবে।



