সরকারি ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে কেন্দ্রের নজর এআই (AI) বিশেষজ্ঞদের দিকে, যেখানে মাসে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে রাজি সরকার! অঙ্কটা শুনলে দেশের শীর্ষ আমলাদের সঙ্গে একটা তুলনা মাথায় আসবেই। তবে শুনতে অবাক লাগলেও সরকারি পরিষেবাকে পুরোদস্তুর বদলে দিতেই এরম পরিকল্পনা কেন্দ্রের।

দেশের ক্যাবিনেট সেক্রেটারির মাসিক বেসিক বেতন ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। সচিব পর্যায়ের আধিকারিকদের বেসিক বেতন ২ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। সেখানে সরকারি ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার বাড়াতে দক্ষ এআই বিশেষজ্ঞের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত কেন্দ্রীয় সরকার। বছরে হিসাব করলে অঙ্কটা প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা।
কিন্তু এখানেই রয়েছে আসল টুইস্ট। ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা কোনও এআই বিশেষজ্ঞের হাতে সরাসরি বেতন হিসেবে যাচ্ছে না। এটি একজন বিশেষজ্ঞের জন্য সরবরাহকারী সংস্থাকে দেওয়া সর্বোচ্চ মাসিক বিলিং হার। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পারিশ্রমিকের পাশাপাশি সংস্থার খরচ ও মার্জিনও থাকতে পারে। তবে এআই (AI) দক্ষতার জন্য সরকার যে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে প্রস্তুত, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

আরও পড়ুন – আলফার নতুন ইনিংস, এবার সোজা ওটিটিতে
ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের (MeitY) অধীন ন্যাশনাল ই-গভর্ন্যান্স ডিভিশন (NeGD) এই নিয়োগের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রথম দরপত্রে প্রায় ৮০টি সংস্থা অংশ নিয়েছিল। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক মূল্যায়নের পরে ছয়টি সংস্থাকে প্যানেলভুক্ত করা হয়। এবার সেই প্যানেলে আরও সংস্থা যোগ করার জন্য নতুন করে দরপত্র খোলা হয়েছে। প্যানেলটি এপ্রিল ২০২৮ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, প্রয়োজনে আরও এক বছর বাড়ানো যেতে পারে।
সবচেয়ে বেশি হার রাখা হয়েছে এআই (AI) বা সলিউশন আর্কিটেক্ট, ডেটা সায়েন্স লিড এবং এআই/এমএল লিডের জন্য—প্রতি মাসে ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা। প্রোগ্রাম বা প্রোডাক্ট ম্যানেজারের জন্য ৪ লক্ষ ১২ হাজার ৫০০ টাকা, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং লিডের জন্য ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং এআই/এমএল ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট ও এমএলঅপস লিডের জন্য ৩ লক্ষ ২০ হাজার ৮৩৪ টাকা পর্যন্ত হার নির্ধারিত হয়েছে। বিজনেস অ্যানালিস্টের ক্ষেত্রেও মাসে ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৬৬ টাকা পর্যন্ত হার রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই জিএসটি (GST) আলাদা। বিশেষ ধরনের দক্ষতার জন্য এআই/এমএল ইঞ্জিনিয়ারের হারের দেড় গুণ পর্যন্ত নেওয়া যেতে পারে, অর্থাৎ প্রায় ৪.৮১ লক্ষ টাকা মাসে।

কিন্তু এত টাকা দিয়ে সরকার আসলে কী করাতে চাইছে? এখানেই গল্পটা আরও আকর্ষণীয়। পরিকল্পনা শুধু এআই (AI) বিশেষজ্ঞ এনে পরামর্শ নেওয়া নয়। সরকারি ব্যবস্থার ভিতরেই তৈরি হতে পারে নিজস্ব এআই পরিকাঠামো। ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টারের মেঘরাজ ক্লাউডে সরকারি কম্পিউটিং ব্যবস্থার উপর বহু-ব্যবহারকারী এআই ইনফারেন্স সার্ভার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প যাতে নিজেদের ব্যবস্থার মধ্যেই এআই পরিষেবা ব্যবহার করতে পারে, সেই পরিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

দীর্ঘ সরকারি নথির সারাংশ তৈরি থেকে শুরু করে ডিজিলকার (DigiLocker) ও উমঙ্গ (UMANG)-এ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় উত্তর দিতে পারা চ্যাটবট—পরিকল্পনার তালিকা বেশ লম্বা। নাগরিক ও সরকারি কর্মীরা যাতে টাইপ না করে কথা বলেই ফর্ম পূরণ করতে পারেন, ভারতীয় ভাষায় সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করার কথা রয়েছে।
এর সঙ্গে সার্টিফিকেট, পরিচয়পত্র, ফর্ম ও স্ক্যান করা পিডিএফ থেকে তথ্য বের করা, উপস্থিতি যাচাই, ই-কেওয়াইসি (eKYC), ডিজিটাল অনবোর্ডিং এবং ডিজিলকারে নথি খোঁজা বা যাচাইয়ের মতো কাজ করতে পারা সফটওয়্যার সহকারী তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে যে কাজ একবার হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে মানুষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে।

আরও পড়ুন – টেক্সাস থেকে বোস্টন, বাংলা ছবির নতুন ইতিহাস ‘বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু’!
অর্থাৎ, ব্যাপারটা শুধু মোটা টাকায় এআই (AI) বিশেষজ্ঞ নিয়োগের নয়। সরকারি পরিষেবার ভিতরেই এআই-কে আরও বড় করে ঢোকানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর সেই কাজে দক্ষ লোক টানতে এবার বেসরকারি প্রযুক্তি দুনিয়ার সঙ্গে টক্কর দিতেই বড় অঙ্কের বিলিং হার সামনে রাখছে কেন্দ্র।
