কলকাতার পুরনো বনেদি বাড়িগুলির ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ (Jorasanko Puja) বাড়ির নাম আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। উত্তর কলকাতার ১২, শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে অবস্থিত এই বাড়ি শুধু একটি প্রাচীন বসতবাড়ি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঊনবিংশ শতকের কলকাতার ব্যবসা, বনেদিয়ানা এবং দীর্ঘদিনের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য।
এই পরিবারের ইতিহাসের সূত্র পাওয়া যায় গোকুলচন্দ্র দাঁ-কে (Jorasanko Puja) ঘিরে। তিনি বর্ধমানের সাতগাছিয়া এলাকা থেকে কলকাতায় এসে বসতি গড়েন। গোকুলচন্দ্রের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর আত্মীয় হলধর দত্তের দুই পুত্রের মধ্যে শিবকৃষ্ণকে তিনি দত্তক নেন। সেই সূত্রেই শিবকৃষ্ণ দত্ত পরবর্তীকালে শিবকৃষ্ণ দাঁ নামে পরিচিত হন। গোকুলচন্দ্রের মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি ও ব্যবসার দায়িত্ব শিবকৃষ্ণের হাতে আসে।
আরও পড়ুন – Dengue Symptoms: ডেঙ্গি মানেই শুধু জ্বর নয়! শরীরে এই লক্ষণগুলি দেখলে আর দেরি নয়
শিবকৃষ্ণ দাঁ (Jorasanko Puja) ছিলেন উনিশ শতকের কলকাতার অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়ী পরিবারের প্রতিনিধি। পারিবারিক ব্যবসাকে তিনি আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কয়লা ব্যবসার কথাও পাওয়া যায়। রাণিগঞ্জ-আসানসোল কয়লাক্ষেত্র অঞ্চলে তিনি খনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৭৬ সালে শিবপুরের কয়লাখনি এলাকায় কয়লা পরিবহণের সুবিধার জন্য আর্মেনীয় প্রতিষ্ঠান Apcar & Co.-র সঙ্গে একটি সরু গেজ রেলপথ তৈরির উদ্যোগের কথাও ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় এসেছে দুর্গাপুজোকে (Jorasanko Puja) ঘিরে। বিভিন্ন সূত্রে পুজোর সূচনাবর্ষ নিয়ে সামান্য মতভেদ রয়েছে—কোথাও ১৮৩৯, আবার অধিকাংশ জনপ্রিয় সূত্রে ১৮৪০ সালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সাল নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে বলা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও সেই পুজো বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
আরও পড়ুন – Why Reheated Food Tastes Different : ফ্রিজের খাবার গরম করলেই স্বাদ বদলায় কেন?
শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির দুর্গাপুজোর (Jorasanko Puja) সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অলঙ্কারের বিশেষ খ্যাতি। পুরনো কলকাতায় প্রচলিত ছিল—‘দেবী মর্ত্যে এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়িতে।’ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সূত্রের উল্লেখ অনুযায়ী, একসময় দুর্গাপ্রতিমাকে সাজানোর জন্য বিদেশ থেকে মূল্যবান পাথর বসানো অলঙ্কার আনার কথাও জানা যায়। এই ঐতিহ্যই দাঁ বাড়ির পুজোকে কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর তালিকায় বিশেষ জায়গা দিয়েছে।
এই বাড়ির স্থাপত্যও তার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনের (Jorasanko Puja) এই প্রাচীন বাড়ির ঠাকুরদালানকে কেন্দ্র করেই পরিবারের পুজো ও নানা অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। একসময় এই বাড়িতে রাতভর যাত্রাপালার আয়োজনও হত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বাড়িটিকে প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেখানে অপেরা-ধাঁচের নাট্যস্থানের মতো নকশার কথাও উঠে এসেছে। শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির (Jorasanko Puja) ইতিহাসের সঙ্গে পুরনো কলকাতার সামাজিক জীবনেরও যোগ রয়েছে। একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন—সব মিলিয়ে এই ধরনের বনেদি বাড়িগুলি উনিশ শতকের কলকাতার নাগরিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই সময়কার ঐশ্বর্য, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ছাপ আজও এই বাড়ির পুজোর রীতিতে দেখা যায়। তবে জোড়াসাঁকোর ‘দাঁ বাড়ি’ (Jorasanko Puja) বলতে যেন ভুল না হয়। এই এলাকায় শিবকৃষ্ণ দাঁ-এর বাড়ির পাশাপাশি নরসিংহ চন্দ্র দাঁ-এর বাড়িও রয়েছে। দু’টি আলাদা পরিবার ও বাড়িকে অনেক সময় একই নামে উল্লেখ করা হয়। তাই শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির ইতিহাস লিখতে হলে ১২, শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনের বাড়িটির কথাই নির্দিষ্টভাবে বলা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন – Maniktala Puja: মানিকতলা সাহা বাড়ির দুর্গাপুজো: দেড়শো বছরের ঐতিহ্যে আজও সাবেকিয়ানার ছোঁয়া
আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া কলকাতায় দাঁড়িয়ে শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি যেন পুরনো শহরের একটি জীবন্ত দলিল। ইট-কাঠের স্থাপত্যের চেয়েও তার বড় পরিচয়—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা পারিবারিক স্মৃতি, বনেদি দুর্গাপুজো এবং উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। তাই এই বাড়ি শুধু একটি পুরনো বাড়ি নয়, কলকাতার ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়।


