জীবনের ট্র্যাফিক সিগন্যালে যখন সব আলো লাল হয়ে যায়, তখন অনেকেই থমকে দাঁড়ান। কিন্তু কর্নাটকের এক সাধারণ পুরোহিতের সন্তান সেই লাল আলোকেই সাফল্যের সবুজ সঙ্কেতে রূপান্তর করার জেদ ধরেছিলেন। একসময় পেটের তাগিদে যিনি তিন চাকার অটোর স্টিয়ারিং ধরেছিলেন, আজ তাঁর গ্যারেজে সগর্বে শোভা পায় আভিজাত্যের শেষ কথা ‘রোলস রয়েস’। এটি কোনো রূপালি পর্দার কাল্পনিক চিত্রনাট্য নয়, এটি ভারতীয় শিল্পপতি সত্যশঙ্কর কে-র বাস্তব জীবনের এক জাদুকরী মহাকাব্য। আজ তাঁর ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার ছুঁয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
গল্পটার শুরু ১৯৮৪ সালে। কর্নাটকের বেল্লারে গ্রামের এক দরিদ্র পুরোহিতের পরিবারে জন্ম সত্যশঙ্করের। চরম আর্থিক অনটনের কারণে দ্বাদশ শ্রেণির পরেই তাঁর পড়াশোনায় ইতি ঘটে। কিন্তু এই বাধাকে নিজের জীবনের শেষ মনে করেননি তিনি। বরং দারিদ্র্য থেকে মুক্তির ছাড়পত্র হিসেবে সরকারি ঋণের সহায়তায় একটি অটো কেনেন। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দ্রুত সেই ঋণ শোধ করে তিনি একটি পুরনো অ্যাম্বাসাডর গাড়ি কিনে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন।
এই ট্যাক্সি চালানোই তাঁর জীবনে সফল হওয়ার প্রথম বড় সূত্রটি এনে দেয়। প্রায়শই বিদেশি পর্যটকদের নিজের গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, পর্যটকেরা যেখানেই যান না কেন, সবার আগে বোতলবন্দি বিশুদ্ধ পানীয় জল কেনেন। স্বাস্থ্য সচেতনতার এই ছোট পর্যবেক্ষণটি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীকালে এক বিশাল ব্যবসার জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন : টলিউডে নতুন অরাজনৈতিক মঞ্চ ‘পারফরমার্স অব বেঙ্গল’
গাড়ি চালানোর চেয়ে গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির ব্যবসায় স্থায়িত্ব বেশি— এই সাধারণ সত্যটি বুঝে ১৯৮৮ সালে একটি ছোট দোকান খোলেন সত্যশঙ্কর। সেখানে ক্রেতাদের বাকিতে জিনিস নিয়ে ছোট ছোট কিস্তিতে টাকা শোধ করার ধরন দেখে তাঁর মাথায় আসে ফিন্যান্স কোম্পানির আইডিয়া। ১৯৯৪ সালে শুরু হয় তাঁর ‘প্রবীণ ক্যাপিটাল’। যেখানে বড় ব্যাংকগুলো পুরনো গাড়িকে পাত্তা দিত না, সেখানে সত্যশঙ্কর সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ির জন্য ঋণ দিয়ে সাধারণ চালকদের স্বপ্নপূরণের কারিগর হয়ে ওঠেন।
তবে মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই পানীয় জলের ব্যবসার স্বপ্নটা তিনি হারাননি। ২০০০ সালে অবশেষে তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকা জলের ব্যবসার স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়,নারিমোগেরু নামক একটি প্রত্যন্ত বৃষ্টিপ্রবণ গ্রামে বিশুদ্ধ পানীয় জলের কারখানা গড়ে তোলেন তিনি, জন্ম নেয় ‘বিন্দু’ (Bindu)। কিন্তু শুধু জল দিয়ে বাজারে টিকে থাকা কঠিন বুঝতে পেরে তিনি নতুনত্বের খোঁজ করতে থাকেন।
আসল চমকটি আসে তাঁর উত্তর ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে। সেখানে সোডার সাথে জিরে ও নুন মেশানোর এক অভিনব ‘দেশি’ স্বাদ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। পুত্তুরে ফিরে তৈরি করেন নিজস্ব ঘরানার এক মশলাদার নরম পানীয়। বাজারে তখন পেপসি বা কোকা-কোলার মতো বহুজাতিক দানবদের একছত্র আধিপত্য। শুরুতে অর্ধেক তৈরি পণ্যই অবিক্রিত হয়ে ফেরত আসত। কিন্তু সত্যশঙ্কর হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী বাজেট ছিল না, তাই দেওয়ালে দেওয়ালে চুনকাম করে নিজেই প্রচারের দায়িত্ব নেন। ধীরে ধীরে গ্রামীণ স্বাদের খাবারের সাথে এই জিরে সোডার যুগলবন্দি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বহুজাতিক সংস্থাকে টেক্কা দিয়ে জয়ী হয় এক খাঁটি ভারতীয় ব্র্যান্ড।
আজ ৬০ বছর পেরিয়েও সত্যশঙ্কর ক্লান্তিহীন। বর্তমানে সত্যশঙ্করের ‘এসজি কর্পোরেটস’ ৯০০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পানীয় ও স্ন্যাক্স ব্যবসা থেকে আসে ৫৭০ কোটি টাকা এবং ফিন্যান্স শাখা থেকে আসে ৩৩০ কোটি টাকা। ৫৫টিরও বেশি পণ্য নিয়ে কর্নাটক, তেলঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশে আজ তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত।
তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য থেকে আজকের যুবসমাজের শেখার রয়েছে বড় পাঠ। সত্যশঙ্কর কোনো পশ্চিমা পণ্যের অন্ধ অনুকরণ করেননি। ভারতের মানুষের নিজস্ব মুখের স্বাদকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি বাজার জয় করেছেন। তিনি নিজের কারখানা কোনো বড় শহরে না করে নিজের গ্রামেই তৈরি করেছেন, যাতে স্থানীয় মানুষকে কাজের সন্ধানে পরিবার ছেড়ে দূরে যেতে না হয়। চারপাশের সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অভ্যাস লক্ষ্য করেই তিনি বড় বড় ব্যবসার আইডিয়া খুঁজে বের করেছেন। তাঁর গ্যারেজে থাকা রোলস রয়েস গাড়িটি আজ কোনো অহংকারের প্রতীক নয়, বরং বেল্লারের মতো এক প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণের কঠোর পরিশ্রম আর হার না মানা মানসিকতার এক মহিমান্বিত স্মারক।



