“ওই লাল মেঝেটা এখনও আছে?”—কলকাতার পুরনো বাঙালি বাড়ি (Bengali old house)র কথা উঠলেই যেন এমন একটা প্রশ্ন থেকেই গল্প শুরু হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে চকচকে লাল মেঝে, খড়খড়ি-শারশির জানলা, উঁচু ছাদ, চওড়া বারান্দা আর ভারী কাঠের দরজা। একটা সময় বাঙালির বাড়ি মানেই যেন এই চেনা ছবিটা। এখনকার ঝকঝকে ফ্ল্যাটে সেই ছবি কোথায় যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

সেই লাল মেঝের কথাই ধরা যাক। পুরনো বাড়িতে (Bengali old house) ঢুকলেই চোখে পড়ত লালচে, মসৃণ মেঝে। গরমের দুপুরে খালি পায়ে হাঁটলে তার পৃষ্ঠ তুলনামূলক ঠান্ডা অনুভূত হত। লাল অক্সাইড মেশানো সিমেন্টের মেঝে তৈরি করে ভালোভাবে পালিশ করা হত। ঠিকঠাক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এটি দীর্ঘদিন টেকসইও হতে পারে। তবে লাল অক্সাইডের মেঝে শুধু বাংলার নয়, ভারতের আরও নানা অঞ্চলের পুরনো বাড়ি ও স্থাপত্যেও দেখা যায়।
আরও পড়ুন – স্মার্টফোনের দুনিয়ায় বিপ্লব! ভারতের বাজারে এল গুগল পিক্সেল ১১ সিরিজের ৪টি ধামাকাদার মডেল

কিন্তু বাঙালি বাড়ির পরিচয় কি শুধু লাল মেঝেতে? মোটেই নয়। “ওই খড়খড়ি শারশির জানলাটা খুলে দে তো”—এই একটা কথাতেই যেন ভেসে ওঠে পুরনো বাড়ির (Bengali old house) ছবি। কাঠের খড়খড়ি বা লুভারযুক্ত জানলা দিয়ে আলো-বাতাস ঢুকত, আবার ঘরের ভিতরটাও কিছুটা আড়ালে থাকত।

কোথাও থাকত বিশাল কাঠের দরজা, মোটা চৌকাঠ, কোথাও খিলান বা দরজার ওপরেই অর্ধচন্দ্রাকৃতি নকশা। সঙ্গে চওড়া মোটা দেওয়াল, প্রশস্ত বারান্দা, বড় উঠোন, মোটা স্তম্ভ, সিলিং- এ কাঠের কড়িবর্গা, বিশাল ছাদ, লম্বা জানলা আর আগের বাঙালি বাড়িতে প্রত্যেকটি ঘরের হাইট ও অনেক বেশি ছিল—সব মিলিয়ে বাড়ির ভিতরেই যেন আলাদা একটা পৃথিবী।
আর একটু পুরনো দিনের বাড়ি (Bengali old house) হলে? রঙিন কাচের জানলা, ঝাড়বাতি, কাঠের কারুকাজ, পুরনো পালঙ্ক, ভারী আসবাব—কত কী! কলকাতা ও বাংলার বহু পুরনো বাড়িতে স্থানীয় স্থাপত্যের সঙ্গে ইউরোপীয় প্রভাবেরও মিশেল দেখা যায়। ফলে একেকটি বাড়ি যেন নিজের মধ্যেই একটা গল্প।
তাহলে আজ সেসব কোথায়?
সময় বদলেছে। যৌথ পরিবারের জায়গায় ছোট পরিবার, উঠোনের জায়গায় ফ্ল্যাট, আর দীর্ঘদিন ধরে কারিগর দিয়ে কাজ করানোর বদলে দ্রুত নির্মাণ—বাড়ির চেহারাও তাই বদলে গেছে। লাল অক্সাইডের মেঝে তৈরি করতে দক্ষ কারিগরি ও সময় লাগে; ভুল কাজ হলে রঙ বা পৃষ্ঠে অসামঞ্জস্যও দেখা দিতে পারে। তার জায়গায় টাইলস, মার্বেল, গ্রানাইট কিংবা ভিট্রিফায়েড টাইলস অনেক বেশি সহজলভ্য ও নকশায় বৈচিত্র্যময়।
আরও পড়ুন – ছ-দিনেও আওয়ারাপন ২কে বিট করতে পারলনা বাটওয়ারা ১৯৪৭
তবু গল্পটা পুরো শেষ হয়নি। ফ্ল্যাটের যুগে বাড়ি বদলেছে, কিন্তু সেই বাড়ির স্মৃতিগুলো কি এত সহজে বদলানো যায়? পুরনো বাড়ির (Bengali old house) সৌন্দর্য নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই নতুন বাড়িতেও পুরনো দিনের ছোঁয়া ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। কোথাও লাল মেঝে, কোথাও কাঠের জানলা, কোথাও পুরনো নকশার দরজা—ফিরছে হারানো স্মৃতির টুকরো।
