জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহের বুকে আজ এক পরম পবিত্র, শীতল ক্ষণ। কাঁসর-ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি আর লক্ষ লক্ষ ভক্তের ‘জয় জগন্নাথ’ আকুল আহ্বানে মুখরিত হয়ে উঠল চারদিক। আজ, ২৯ জুন, ২০২৬, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে সনাতন ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় রীতি মেনে দেশজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে মহাপ্রভুর পবিত্র স্নানযাত্রা উৎসব। ওড়িশার শ্রীক্ষেত্র পুরী থেকে শুরু করে আপামর বাংলার কোণায় কোণায় আজ ভক্তি, আবেগ আর ভক্তের ব্যাকুলতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই পুণ্য তিথির হাত ধরেই শুরু হয়ে গেল উৎসবের মহোত্তম কাউন্টডাউন— আজ থেকে ঠিক ১৫ দিন পর, আগামী ১৬ জুলাই মহাসড়কে টান পড়বে বহু প্রতীক্ষিত রথের রশিতে।
আরও পড়ুন – রত্নবেদী ফাঁকা, শ্রীমন্দিরে নেমে এলো নীরবতা! কোথায় গেলেন জগতের নাথ?
শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের রঙে আজ সেজে উঠেছে বাংলার কোণ কোণ। হুগলির প্রাচীন মাহেশের জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণ আজ লাখো ভক্তের চোখের জলে ও আবেগে ভাসমান। যা ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রার পীঠস্থান—সেখানে আজ উদযাপিত হলো প্রভুর ৬৩০তম স্নানযাত্রা। ২৮ ঘড়া গঙ্গাজল এবং দেড় মণ খাঁটি দুধে স্নান করানো হলো তিন বিগ্রহকে।

অন্যদিকে নদীয়ার মায়াপুরের রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরেও হাজার হাজার দেশি-বিদেশি ভক্তের উপস্থিতিতে মহাস্নান সম্পন্ন হয়। গঙ্গাজল, দুধ, দই, মধু ও ঘিয়ের সুবাসে মায়াপুরের বাতাস যেন এক অলৌকিক রূপ ধারণ করে। এছাড়া হুগলির গুপ্তিপাড়া, পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল এবং কলকাতার ইসকন মন্দিরেও সকাল থেকে ছিল বিপুল উদ্দীপনা।

শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে, এই মহাস্নানপর্ব সমাপনের পর মহাপ্রভুকে সাজানো হয়েছে ভক্তদের পরম প্রিয় ‘গজবেশ’ বা ‘হাতিবেশে’। তবে এই আনন্দের পরই মন্দির জুড়ে নেমে আসবে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, টানা ১০৮ কলস ঠাণ্ডা জলে স্নান করার কারণে আজ রাত থেকেই ‘ধুম জ্বরে’ আক্রান্ত হবেন জগন্নাথদেব। ফলে আগামী ১৫ দিন তিনি সম্পূর্ণ নিভৃতবাসে বা ‘অনবসর’-এ থাকবেন। এই দিনগুলিতে গর্ভগৃহের সাধারণ দর্শন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। রাজবৈদ্যের দেওয়া বিশেষ ভেষজ পাঁচন আর গোপন উপাচারে সুস্থ হয়ে, রথযাত্রার ঠিক আগের দিন ‘নেত্রোৎসব’ বা ‘নবযৌবন রূপে’ পুনরায় ধরা দেবেন বিশ্বনাথ।
আরও পড়ুন – বর্ষাকালে AC-এর কোন মোড ব্যবহার করা উচিত?
বাংলার এই উৎসবের সমান্তরালে আজ ওড়িশার পুরীর আদি শ্রীক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব জনসমুদ্র। পুরীর বিখ্যাত স্নানমণ্ডপে ‘সুনাকুয়া’ বা সোনার কুয়ো থেকে তোলা ১০৮ ঘড়া সুবাসিত জলে স্নান সেরেছেন ত্রিমূর্তি। পুরী থেকে বাংলার মাহেশ— আজ সমস্ত ভৌগোলিক সীমানা মুছে ভক্তি ও প্রেম মিলেমিশে একাকার। বছরের এই বিশেষ দিনটিতে জাত-পাত নির্বিশেষে ভগবান স্বয়ং মন্দির থেকে বাইরে রাজপথে বেরিয়ে আসেন তাঁর সন্তানদের দর্শন দিতে। আজ স্নানযাত্রার পুণ্যলগ্নে সেই পরম আধ্যাত্মিক প্রেমের জোয়ারেই ভাসল আপামর বাংলা।



