আগামীকাল, ২৯শে জুন। বছর ঘুরে আবার সেই পুণ্যলগন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে মহাসমারোহে পালিত হতে চলেছে জগন্নাথ দেবের মহাপবিত্র ‘স্নানযাত্রা’ বা ‘দেবস্নান পূর্ণিমা’। শঙ্খধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টার গম্ভীর আওয়াজ আর লক্ষ লক্ষ ভক্তের ব্যাকুল ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত ওড়িশার শ্রীক্ষেত্র।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের এই বিশেষ পূর্ণিমা তিথিতেই গর্ভগৃহের রত্নবেদী ছেড়ে রাজকীয় শোভাযাত্রা বা ‘পহণ্ডি’ করে বাইরে আসেন জগতের নাথ জগন্নাথ, বড়ভাই বলভদ্র এবং আদরের বোন সুভদ্রা। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ভক্ত ও ভগবানের এক পরম মিলন উৎসব। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ দিনটিই হলো মহাপ্রভু জগন্নাথের প্রকাশ দিবস বা জন্মতিথি।
আরও পড়ুন – বর্ষাকালে AC-এর কোন মোড ব্যবহার করা উচিত?
পৌরাণিক মহিমা – স্কন্দপুরাণ এবং নীলান্দ্রি মহোদয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, এই স্নানযাত্রার দিনটিই হলো পরমেশ্বর জগন্নাথদেবের শুভ আবির্ভাব তিথি। সত্যযুগে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন প্রথম এই দারুব্রহ্ম বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এই স্নান উৎসবের সূচনা করেছিলেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— “স্নানমঞ্চে স্থিতং দৃষ্ট্বা স্বামীনাং চ জগদ্গুরুম। কলৌ কল্মষ নাশায় দর্শনং পাপনাশনম॥” অর্থাৎ, কলিযুগে স্নানবেদীতে অধিষ্ঠিত জগন্নাথদেবকে দর্শন করলে মানুষের জন্মান্তরের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। এই বিশ্বাসেই জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বের মানুষ আজ একাকার হন বড়ডাণ্ডায়।
আরও পড়ুন – যেতে হবে না বিদেশ, অচেনা ভারতেই পর্যটনের নতুন ঠিকানা!
পহণ্ডী – উৎসবের দিন ভোরবেলা মঙ্গল আরতির পর শুরু হয় ‘পহণ্ডী’। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা দেবী এবং সুদর্শন চক্রের বিগ্রহগুলিকে মূল গর্ভগৃহ থেকে কাঁধে করে বহন করে আনেন দৈতাপতিরা। তারপর দেবতাদের রেশমি কুশন বা ‘তাকিয়া’ দিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে এক বিশেষ ছন্দে শঙ্খ, ঘণ্টা, করতাল আর ভক্তদের “জয় জগন্নাথ” ধ্বনির সাথে এগিয়ে নিয়ে যান মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত উঁচু ‘স্নান বেদি’-তে।

১০৮ কলসের পুণ্যস্নান – এদিন স্নানযাত্রার মূল আকর্ষণ হল মহাপ্রভুর মহাস্নান। মন্দিরের উত্তর দিকে অবস্থিত বিশেষ ‘সুনাকূয়া’ বা স্বর্ণকূপ থেকে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ১০৮টি কলসে অত্যন্ত গোপনে জল সংগ্রহ করেন দৈতাপতি ও সেবায়েতরা, যা সারা বছরে কেবল এই একদিনই ব্যবহার করা হয়। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও সাথে কর্পূর, চন্দন, অগুরু, জাফরান ও তুলসী পাতা মিশ্রিত মোট ১০৮টি কলসির জল ঢালা হয় দেবতাদের শ্রীঅঙ্গে। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে এর মধ্যে জগন্নাথদেব পান ৩৫টি, বলভদ্র ৩৩টি, দেবী সুভদ্রা ২২টি এবং সুদর্শন চক্র পান ১৮টি কলসীর জল।

স্নানের ঠিক পরেই পুরীর রাজবংশের বর্তমান প্রধান বা গজপতি মহারাজা স্নান বেদিতে আসেন। তিনি দেবতাদের উদ্দেশ্যে আরতি করেন এবং একটি সোনার ঝাড়ু দিয়ে স্নান বেদির চারপাশ পরিষ্কার করেন। এরপর চন্দন জল ছেটানো হয়। এই প্রথাটি প্রমাণ করে যে, ঈশ্বরের দরবারে রাজা থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই সমান এবং সবাই তাঁর সেবক।
আরও পড়ুন – জানেন ২১ দিন শুকনো লঙ্কা না খেলে শরীরে কী কী ঘটে?
গজবেশ – এই মহাস্নানের ঠিক পরেই ভক্তদের জন্য অপেক্ষা করে এক পরম কাঙ্ক্ষিত অলৌকিক দৃশ্য— ‘গজবেশ’ বা ‘হাতিবেশ’। স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, কর্ণাটকের এক নিষ্ঠাবান গণেশ ভক্ত গণপতি ভট্ট পুরীতে এসেছিলেন জগন্নাথ দর্শন করতে। কিন্তু শ্রীবিগ্রহের মধ্যে নিজের ইষ্টদেব গণেশকে না দেখে তিনি কিছুটা বিষণ্ণ মনে ফিরে যাচ্ছিলেন।

ভক্তের মনের আকুলতা ও অভিমান বুঝতে পেরে দয়াময় জগন্নাথদেব স্বয়ং গণেশের রূপ ধারণ করেন। সেই থেকে আজও স্নানযাত্রার বিকেলে তিন ভাই-বোনকে সাজানো হয় রাজকীয় হাতিবেশে, যা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন।
আরও পড়ুন – প্রেসক্রিপশন ছাড়া আর মিলবে না কাফ সিরাপ, নির্দেশ কেন্দ্রের!
অনবসর – তবে এই আনন্দ উৎসবের ঠিক পরেই এক গভীর বিষাদ নেমে আসে ভক্তদের মনে। লোকপরম্পরা ও লীলা অনুযায়ী, তীব্র গরমে একনাগাড়ে অত কলসী জল ঢালার কারণে মহাপ্রভুর ‘জ্বর’ আসে। একে বলা হয় ‘অনবসর’ বা ‘অণসর’ কাল। পরবর্তী ১৫ দিন মহাপ্রভু সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকবেন। অসুস্থ দেবতাদের মূল মন্দির থেকে সরিয়ে একটি অন্ধকার গোপন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যাকে ‘অনবসর ঘর’ বা ‘অণসর পিণ্ডি’ বলা হয়। এই ১৫ দিন মন্দিরের মূল দরজা সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এই সময় দেবতাদের কোনো অন্নভোগ দেওয়া হয় না। পুরীর রাজবৈদ্যের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ ভেষজ উপায়ে চিকিৎসা চলে তাঁদের।

নবযৌবন – দীর্ঘ ১৫ দিন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পর দেবতারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে দেবতারা আবার জনসাধারণের সামনে আসেন। সুস্থ হওয়ার পর দেবতাদের যে প্রথম দর্শন মেলে, তাকে বলা হয় ‘নবযৌবন বেশ’ বা ‘নেত্রোৎসব’। এই দিন দেবতাদের চোখের মণি নতুন করে তুলি দিয়ে আঁকা হয়, যার মাধ্যমে বিগ্রহগুলি আবার সজীব হয়ে ওঠে। আর এর ঠিক পরদিনই জগতকে উদ্ধার করতে মহাপ্রভু তাঁর ভাই ও বোনকে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি-র উদ্দেশ্যে রওনা হন, যা বিশ্বজুড়ে রথযাত্রা উৎসব নামে মহাসমারোহে পালিত হয়।
পুরীর এই স্নানযাত্রা প্রমাণ করে—তিনি কেবল পাথরের বা কাঠের মূর্তি নন, তিনি জীবন্ত। ভক্তের আবেগের সাথে জড়িয়ে থাকা এক পরমাত্মা।



