আধুনিক ব্যস্ত জীবনে ‘ঘুম’ (Sleep Deprivation) যেন এক বিলাসী শব্দ! সারাদিনের ইঁদুরদৌড়ে আমরা সবচেয়ে বেশি যেটার সঙ্গে আপস করি, তা হলো ঘুম। অনেকেরই ধারণা, রাতে ৫-৬ ঘণ্টা চোখ বুজে থাকলেই হলো! আবার কেউ কেউ ভাবেন, সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়েই সুদে-আসলে উসুল করে নেবেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, শরীর নামক যন্ত্রটির হিসাব-নিকাশ এত সোজা নয়। ঘুমের পরিমাণ নয়, আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে ঘুমের মানে।
ঘুমের সময় আমাদের শরীর আপাতদৃষ্টিতে নিস্তেজ মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে চলে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত থেকে শুরু করে স্মৃতিশক্তি গুছিয়ে রাখা—সবই হয় এই সময়ে। তাই ঘুম পর্যাপ্ত না হলে শরীর তার নিজস্ব ভাষায় কিছু সংকেত বা অ্যালার্ম দেয়, যা দেখলে বুঝবেন আপনার শরীরে জরুরি বিশ্রামের চরম অভাব দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বর নয়, পেটের ব্যথাতেই লুকিয়ে মৃত্যুফাঁদ! টিকা আসার আগেই ঘনাচ্ছে কালো মেঘ
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হল সারাদিন চা বা কফির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। সকালে চোখ খুলতেই কড়া কফি চাই? আবার বিকেলে কাজের মাঝে এনার্জি পেতে বারবার চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন? সাময়িকভাবে ক্যাফেইন আপনাকে চনমনে রাখলেও, এটি আসলে শরীরের গভীর ক্লান্তিকে ধামাচাপা দেয়। এর ফলে রাতের ঘুম আরও বিঘ্নিত হয় এবং আপনি এক অন্তহীন ক্লান্তির চক্রে ফেঁসে যান।
ঘুমের ঘাটতি (Sleep Deprivation) হলে খাবারের অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। হঠাৎ করে মিষ্টি, চকোলেট, ফাস্ট ফুড বা তেলেভাজা খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। কারণ ঘুমের ঘাটতি শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
যদি লক্ষ্য করেন, আগের তুলনায় বারবার সর্দি-কাশি বা ভাইরাল সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাহলে তার কারণও হতে পারে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব (Sleep Deprivation)। ঘুমের সময়ই শরীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার কাজ করে। বিশ্রাম কম হলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া মনোযোগ কমে যাওয়া, ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়া, কাজের সময় বারবার ভুল হওয়া বা সারাক্ষণ মাথা ঝিমঝিম করাও ঘুমের ঘাটতির (Sleep Deprivation) লক্ষণ হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না। ফলে পড়াশোনা, অফিসের কাজ বা দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রভাবিত হয়।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর প্রভাব পড়ে। অল্পতেই রেগে যাওয়া, বিরক্ত লাগা, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া বা অকারণে মন খারাপ থাকা অনেক সময় ঘুমের অভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে থাকলে মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভালো মানের ঘুম প্রয়োজন। তবে শুধু সময় পূরণ করলেই হবে না। যদি মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, জোরে নাক ডাকার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হয় বা সকালে ঘুম থেকে উঠেও ক্লান্ত লাগে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন: রান্নাঘরের ৩ জিনিসেই লুকিয়ে বিষের ফাঁদ!
স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য রাতে নির্দিষ্ট সময়ে শোয়ার অভ্যাস করুন, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের ব্যবহার কমান, সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলুন এবং নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা করুন। মনে রাখবেন, ভালো ঘুম কোনও বিলাসিতা নয়—এটাই সুস্থ শরীর, সতেজ মন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের অন্যতম ভিত্তি।





