HomeদেশVaranasi: বারাণসীর ঘাটে 'বঙ্গদর্শন'! বেনারসের বাঙালি লাইব্রেরি ও আড়াই লাখ প্রবাসীর লড়াই

Varanasi: বারাণসীর ঘাটে ‘বঙ্গদর্শন’! বেনারসের বাঙালি লাইব্রেরি ও আড়াই লাখ প্রবাসীর লড়াই

বেনারসের (Varanasi) গঙ্গার ঘাটে যখন সন্ধ্যার আরতি জমে ওঠে, কাঁসার ঘণ্টার শব্দে মুখরিত হয় চারপাশ, ঠিক তখনই জঙ্গমবাড়ির এক পুরনো গলির ভেতরে জ্বলে ওঠে এক নিঃশব্দ প্রদীপ । ১৮৬৬ সালে গড়ে ওঠা এই বেনারসের বাঙালি লাইব্রেরি বা ‘বঙ্গ সাহিত্য সমাজ’ কেবল কোনো পুরোনো ইটের দালান বা বইয়ের দোকান নয়; এটি বারাণসীতে বাঙালির ১৫০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস, অস্তিত্বের সংগ্রাম এবং প্রবাসী অস্মিতার এক জ্যান্ত দলিল।

মানুষ সাধারণত রুটি-রুজির টানে ঘর ছাড়ে। কিন্তু কাশীর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটা শুধু জীবিকার নয়; তা হলো আত্মার টান, মোক্ষ লাভ আর বিদ্যার্জনের এক শাশ্বত আশ্রয়। পাল যুগ কিংবা তারও আগে থেকে যে বেনারসে (Varanasi) বাঙালির যাতায়াত, আজ সেই হাজার বছরের সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিচিহ্ন হয়ে টিকে আছে এই লাইব্রেরি। কিন্তু আধুনিকতার রূপান্তর আর কমে আসা বাঙালি জনসংখ্যার চাপে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন: যাত্রীদের জন্য বিরাট সুখবর! এক ক্লিকেই ট্রেনের টিকিট বুকিং, দরজায় রেডি থাকবে ক্যাবও

বিদ্যাসাগরের দান আর রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন

গল্পটার সূচনা আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগে, ১৮৬৬ সালে। স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায় এবং গোপালচন্দ্র পাকড়াশীর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল এই বঙ্গ সাহিত্য সমাজ। মাত্র ১৫৫টি বই নিয়ে এক ছোট্ট ঘরে যাত্রা শুরু হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৫টি বইই ছিল বিশিষ্ট জনদের উপহার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বামাসুন্দরী দেবী এবং অমৃতলাল মিত্রের মতো মহান ব্যক্তিদের হাতের ছোঁয়া লেগেছিল সেই সংগ্রহে।

পরবর্তীতে প্রায় পাঁচ দশক পর, ব্যোমকেশ মুস্তাফির প্রস্তাবে এটি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-এর বারাণসী শাখা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এক সভায় এসে আহ্বান জানিয়েছিলেন—জগতের সমস্ত প্রান্ত থেকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যরত্নকে এখানে সংগ্রহ করে রাখতে হবে। নানা স্থান পরিবর্তনের পর, গত শতাব্দীর শেষ দশকে জঙ্গমবাড়ীর ‘তারাচরণ সাহিত্যাচার্য স্মৃতি ভবন’-এ নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায় এই প্রতিষ্ঠান।

কমে আসা জনসংখ্যা ও প্রবাসীর সংকট

সোনারপুরা থেকে বাঙালিটোলা—একসময় যে শহরের গলিতে বাংলা ভাষার গুঞ্জন ভেসে বেড়াত, আজ সেখানে জনমিতি বদলে গেছে। ২০-২২ লাখ জনসংখ্যার বেনারসে আজ বাঙালির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৫ লাখে। বিগত ৫০ বছরে প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে।

তিন পুরুষ ধরে বেনারসে (Varanasi) বসবাসকারী দিলীপ বাবুর কণ্ঠে তাই বিষাদের সুর, “বাংলায় যদি বাঙালির সমৃদ্ধি না ঘটে, তবে প্রবাসে আমরা আমাদের বাঙালি পরিচয় টিকিয়ে রাখব কীভাবে?” তবে এই হতাশার মাঝেও আশার প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের (BHU) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত ভট্টাচার্য। তাঁর বিশ্বাস, হয়তো এই প্রবাসী সমাজ থেকেই উঠে আসবে নতুন কোনো নেতৃত্ব, যা আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলবে বাঙালি অস্মিতাকে।

২০ হাজার দুর্লভ বই ও এআই-এর যুগে প্রতিরোধ

বর্তমানে মাত্র ২৫০ জন সক্রিয় সদস্য নিয়ে টিকে থাকা এই লাইব্রেরির রত্নভাণ্ডার যেকোনো গবেষককে অবাক করবে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে সারিবদ্ধ বই আর প্রথম তলায় জমা হয়ে আছে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম দিকের দুর্লভ সংখ্যা।

আজকের ‘শর্টকাট’ পাঠ্যাভ্যাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই লাইব্রেরির অভিভাবক অধ্যাপক সুব্রত ভট্টাচার্য শুরু করেছেন এক নীরব যুদ্ধ। নিজের ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেও তিনি একাই হাত দিয়েছেন প্রায় ২০,০০০ বইয়ের ‘ডিজিটাল ক্যাটালগ’ তৈরির কাজে। তাঁর লক্ষ্য—প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই এই ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কাশীর আসল পরিচয় ও এক আহ্বান

প্রতি রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টা—সপ্তাহে মাত্র এই দুই ঘণ্টার জন্য খোলে ইতিহাস ছোঁয়া এই ভবনের দরজা। পুরনো বইয়ের পাতার সুবাস আর ধুলোবালি মাখা স্মৃতির মাঝে হাঁটলে মনে হয়, পুরনো পাঠকদের দীর্ঘশ্বাস আজও যেন সেখানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রিলস আর এআই-এর কৃত্রিম দুনিয়ায় বেনারসের এই বাঙালি লাইব্রেরি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কাশীর আসল পরিচয়—যা কোনো যান্ত্রিক শহর নয়, যা জন্ম নিয়েছিল জ্ঞানের আলো থেকে।

আরও পড়ুন: মৃত্যুর পর আত্মা কি ফেরে?

বর্ষায় যখন গঙ্গার ঘাটগুলো জলে ডুবে যায়, আর টিমটিমে হলুদ প্রদীপের আলোয় আধুনিক কৃত্রিমতার ধাক্কা লাগে, তখন বেনারসের (Varanasi) এই ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— বাঙালি সত্তার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তার জ্ঞানচর্চায়। বেনারসের বাংলা লাইব্রেরি কেবল বইয়ের স্তূপ নয়, এটি প্রবাসের বুকে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক অমর অকৃত্রিম দুর্গ।

Stay Connected
Must Read