মৃত্যুর পর আত্মার (soul ) আসলে কী হয় ? মারা যাওয়ার পর কি সবকিছুর শেষ, নাকি শরীরটা থেমে গেলেও কোনওভাবে থেকে যায় ‘পুরনো অস্তিত্ব’? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে ধর্ম, দর্শন আর মানুষের বিশ্বাসে নানা কথা শোনা যায়। কিন্তু বিশ্বাসের কথা আর প্রমাণিত সত্য—দুটোকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
হিন্দু দর্শনে মৃত্যুকে জীবনের একেবারে শেষ বলে ধরা হয় না। বরং জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মকে একটি চক্র হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মফল বা ‘কর্ম’-এর তত্ত্ব। অর্থাৎ, মানুষের কাজের প্রভাব পরবর্তী অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এমন বিশ্বাস বহু ভারতীয় ধর্মীয় দর্শনে রয়েছে।

পরলোক-সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় আরও রহস্যময় একটি ধারণার কথা বলা হয়। দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর আত্মা (Soul) র কাছে নাকি স্থান বা সময়ের পার্থিব সীমারেখা আর আগের মতো থাকে না।
তবে এখানেই আসল প্রশ্ন—মৃত্যুর পর আত্মা(Soul) কি সত্যিই আগের জীবনে ফিরে আসে? ধর্মীয় বিশ্বাসের উত্তর অনেক ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ হলেও, বিজ্ঞান এখনও এমন কোনও চূড়ান্ত, সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ দিতে পারেনি, যা পুনর্জন্ম বা মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে।
আবার বিষয়টি একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। অতীত জীবনের স্মৃতি থাকার দাবি করা কিছু মানুষের ঘটনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের কথিত ‘past-life memories’ নিয়ে নানা কেস নথিবদ্ধ হয়েছে। তবে এই ঘটনাগুলিকে পুনর্জন্মের চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার মতো ঐকমত্য এখনও তৈরি হয়নি।
আরও পড়ুন – ‘দেশু ৭’-এর শেষ শুটিং, দেবকে নিয়ে আবেগঘন পোস্ট শুভশ্রীর
শোনা যায় মৃত্যুর পর সাত মিনিট ধরে জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যদিও এই কথার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মৃত্যুপথযাত্রী এক ৮৭ বছর বয়সি মৃগীরোগে আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপের বিরল রেকর্ড পাওয়া যায়। EEG-তে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের সময় তাঁর হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হওয়ার আগে ও পরের সময়ের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ গবেষকেরা রেকর্ড করতে সক্ষম হন।
রেকর্ডে বিশেষ করে gamma oscillation-এর পরিবর্তন দেখা যায়। মনে হচ্ছিল যেন লোকটির মস্তিষ্ক তার জীবনের মুহূর্তগুলোকে শেষবারের মতো আত্মসমীক্ষার অংশ হিসেবে পুনরায় দেখছিল। এটিই প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয় যে, হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও মৃত্যুপথযাত্রী মস্তিষ্ক সক্রিয়, এমনকি সুসংগঠিতও থাকতে পারে। এবং গবেষকদের মতে সম্ভবত—মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে মস্তিষ্ক হয়তো এমন কিছু কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে পারে, যা স্মৃতি বা চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে গবেষণাপত্রের লেখকেরাও এটিকে মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তে স্মৃতি replay হওয়ার সরাসরি প্রমাণ বলেননি। বরং তাঁরা এই সম্ভাবনাকে ‘intriguing’ বা আকর্ষণীয় অনুমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবার লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, দেহ না থাকলেও প্রিয়জনের প্রতি টান সহজে মুছে যায় না। সেই টান থেকেই নাকি মৃতের সঙ্গে জীবিতের এক ধরনের অদৃশ্য যোগাযোগ ঘটতে পারে। মারা গেলেও আত্মা (Soul) কিন্তু তাঁর প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা থামায় না । শেষ মুহূর্তে প্রিয়জনদের সঙ্গে শেষ কথা বলা না হলেও যেভাবে হোক সে যোগাযোগ করতে , কথা বলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। সেই যোগাযোগ নাকি শব্দে নয়, গভীর অনুভূতি বা চিন্তার মাধ্যমে ঘটে। কখনও হঠাৎ কোনও প্রিয় মানুষের কথা মনে পড়ে যাওয়া, অকারণে পুরনো কোনও স্মৃতি তীব্র হয়ে ওঠা কিংবা অদ্ভুত কোনও অনুভূতি তৈরি হওয়াকে কেউ কেউ সেই অদৃশ্য যোগাযোগের ইঙ্গিত বলে মনে করেন।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সব ধর্মে ‘আত্মা (Soul) ফিরে আসা’র ধারণা একই নয়। যেমন হিন্দু দর্শনে পুনর্জন্মের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বৌদ্ধ দর্শনে চিরস্থায়ী আত্মার ধারণা আলাদা ভাবে দেখা হয়। তাই ‘মৃত্যুর পর সবাই একইভাবে ফিরে আসে’—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

আরও পড়ুন – হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি বাড়ির সেই চেনা মুখ?
তাহলে সত্যিটা কী? আপাতত সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর হল—মৃত্যুর পর আত্মা (Soul) ফিরে আসে কি না, তা ধর্মীয় বিশ্বাস ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বিজ্ঞান এখনও সেটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রমাণ করেনি। তাই রহস্যটা রয়ে গিয়েছে—আর সেই কারণেই মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলও আজও শেষ হয়নি।
