হলুদ তো দেশের প্রায় প্রতিটি রান্নাঘরেই থাকে। কিন্তু মেঘালয়ের এক বিশেষ হলুদ যেন সেই পরিচিত গণ্ডি ছাপিয়ে এখন বিশ্বমঞ্চে। নাম ‘লাকাডং’ (Lakadong)। জয়ন্তিয়া পাহাড়ের এই হলুদ স্থানীয় চাষের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে আন্তর্জাতিক আলোচনায়। জি-৭ (G7) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মেঘালয়ের জিআই (GI)-স্বীকৃত লাকাডং হলুদ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আর তারপর থেকেই পাহাড়ের এই ‘সোনালি মশলা’কে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে আগ্রহ।

কিন্তু লাকাডংয়ের (Lakadong) এমন কী বিশেষত্ব, যার জন্য এত আলোচনা? আসল চমক রয়েছে এর কারকিউমিন (curcumin)-এ। এই হলুদে কারকিউমিনের মাত্রা ৭ থেকে ১২ শতাংশ। খাবারে ব্যবহারের পাশাপাশি কারকিউমিনের ব্যবহার রয়েছে নিউট্রাসিউটিক্যাল (nutraceutical), ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পেও। এক দশক আগেও মেঘালয়ের বাইরে লাকাডং নামটি খুব বেশি পরিচিত ছিল না। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। লাকাডংকে ‘ব্র্যান্ড নর্থ ইস্ট’ (Brand North East)-এর গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে।
আরও পড়ুন – ‘পারিবারিক শিক্ষা’ নিয়ে খোঁটা! তাপসীকে ফের ‘সস্তা কপি’ কটাক্ষ কঙ্গনার
জয়ন্তিয়া হিলসের মাটি, আবহাওয়া ও প্রচুর বৃষ্টিপাত এই হলুদ চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। ফলে স্থানীয় কৃষকদের কাছে লাকাডং (Lakadong) শুধু একটি ফসল নয়, আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসও। বর্তমানে ১২৪টি গ্রামের ১৩ হাজারেরও বেশি কৃষক লাকাডং চাষের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ২,৫৮১ হেক্টর জমিতে হচ্ছে এই হলুদের চাষ। কৃষকদের সংগঠিত করতে তৈরি হয়েছে ১৫টি সমবায়ী গোষ্ঠীও।

তবে শুধু ভালো হলুদ ফলালেই বিশ্ববাজার দখল করা সম্ভব নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হল সেই ফসলকে আরও মূল্যবান ও মানসম্মত পণ্যে পরিণত করা। সেই জায়গাতেই এবার জোর দিচ্ছে মেঘালয়। লাকাডংকে (Lakadong) কেন্দ্র করে ১৭৫.৪৫ কোটি টাকার ‘মিশন গোল্ডেন স্পাইস’ (Mission Golden Spice) শুরু হয়েছে। পাঁচ বছরের এই প্রকল্পে চাষ থেকে প্রক্রিয়াকরণ, কারকিউমিন নিষ্কাশন, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং ও রফতানি—পুরো ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
লাকাডংকে (Lakadong) শুধু কাঁচা হলুদ হিসেবে বিক্রি না করে কারকিউমিন নির্যাস, ওলিওরেজিন (oleoresin) এবং উন্নতমানের হলুদ গুঁড়োর মতো মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই প্রক্রিয়াকরণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। পশ্চিম জয়ন্তিয়া হিলসে বড় আকারের জৈব হলুদ প্রক্রিয়াকরণ ও কারকিউমিন নিষ্কাশন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর বার্ষিক প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ৭,০০০ মেট্রিক টন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

সরকারের নজরে রয়েছেন কৃষকরাও। জয়ন্তিয়া হিলসের চাষিদের আয় বাড়ানো এবং তাঁদের জন্য আরও ভালো বাজার তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। কৃষক উৎপাদক সংগঠন বা এফপিও (FPO)-র জন্য প্যাকহাউস ও গুদাম তৈরির পাশাপাশি উন্নত চাষের উপকরণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে। ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—মাঠ থেকে বেরিয়েই যাতে কম দামে ফসল বিক্রি করতে না হয়, বরং কৃষক সরাসরি বেশি দামের বাজারের সুবিধা পান।
২০২৪ সালের মার্চে লাকাডং (Lakadong) হলুদ জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার এই বিশেষ হলুদের পরিচিতি আরও মজবুত হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পশ্চিম জয়ন্তিয়া হিলসের লাসকেইনে বায়ো-কারকিউমিন (Bio-Curcumin) নিষ্কাশন কেন্দ্র চালু হয়। প্রতিদিন ২০০ কেজি শুকনো হলুদ প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা রয়েছে কেন্দ্রটির।
লাকাডংয়ের বিদেশযাত্রাও শুরু হয়ে গিয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস ও রাশিয়ায় এই হলুদ রফতানি হয়েছে। এবার লক্ষ্য আরও বড়—আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজারে লাকাডংয়ের জায়গা আরও শক্ত করা।
২০৩০ সালের মধ্যে লাকাডং চাষের এলাকা বাড়িয়ে ৭,০০০ হেক্টর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মেঘালয়ের কাছে লাকাডং এখন শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও।
আরও পড়ুন – চার মাস পরেই মহাকাশে গগনযান, ইসরো

তবে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেওয়ার পরীক্ষাও কম নয়। মান বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় শংসাপত্র, পণ্যের উৎসের নিশ্চয়তা, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং নিয়মিত সরবরাহ—সবই গুরুত্বপূর্ণ। জি-৭-এর মঞ্চে লাকাডং (Lakadong) পৌঁছে গিয়েছে। এবার পাহাড়ের মাটি থেকে উঠে আসা এই হলুদ কতটা দূর যেতে পারে, উত্তর দেবে আগামী কয়েক বছর।
