সকাল ন’টার লোকাল ট্রেন ধরার তাড়া নেই, বসের ইমেলের পাহাড় নেই, ডেডলাইনের চাপও এক্কেবারে গায়েব! কারণ আপনার হয়ে সব কাজ নিখুঁতভাবে করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। ভাবুন তো, জীবনটা ঠিক কেমন হতো? বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সিনেমার মতো এক্কেবারে ‘পারফেক্ট’, তাই না? কিন্তু একটু গভীরে ভাবলেই শরীর শিউরে ওঠে। এই ‘অনন্ত অবসর’ কি সত্যিই আমাদের কোনো সুখের স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি অজান্তেই আমরা পা বাড়াচ্ছি এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নে ?

সিনেমার পর্দায় আমরা প্রায়ই দেখি, রোবটরা সব কাজ করছে আর মানুষ অলস আমোদে দিন কাটাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে একে পরম শান্তি মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম মানসিক বিপর্যয়। বিজ্ঞানীরা এবং সমাজতাত্ত্বিকরা ইদানীং এক অদ্ভুত আশঙ্কার কথা শোনাচ্ছেন। তাঁদের মতে, এআই যদি মানুষের সব কাজ কেড়ে নেয়, তবে সেই পৃথিবী কোনো স্বপ্নের সুন্দর জগৎ হবে না; বরং তা হয়ে উঠতে পারে এক ভয়ংকর অবক্ষয়ের দুনিয়া।

- কেন এই কর্মহীন ভবিষ্যৎ এতটা আশঙ্কাজনক?
মানুষের বেঁচে থাকার একটা বড় রসদ হলো কাজের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করা। কাজ শুধু রোজগারের মাধ্যম নয়, এটি মানুষকে একটি সামাজিক পরিচয় ও বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য দেয়। সব কাজ হারিয়ে মানুষ যদি কেবলই অলস বসে থাকে, তবে মানসিক অবসাদ ও শূন্যতা গ্রাস করবে পুরো সমাজকে।
AI-এর যুগে সম্পদ কুক্ষিগত হবে গুটি কয়েক প্রযুক্তি জায়ান্ট বা ধনকুবেরদের হাতে। সাধারণ মানুষের কোনো কাজ থাকবে না। সরকার হয়তো বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম ভাতা দেবে, কিন্তু তা কি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবে?
যখন চিন্তাভাবনা বা সৃজনশীল কাজটাও যন্ত্র করবে, তখন মানুষের মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়বে। নতুন কিছু সৃষ্টি করার আনন্দ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে মানবজাতি।

শ্রমহীন জীবন আসলে এক ধরনের অদৃশ্য বন্দিত্ব। মানুষ যখন সৃষ্টির আনন্দ থেকে দূরে সরে যায়, তখন সে নিজেই একপ্রকার জড়বস্তুতে পরিণত হয়। যে সৃজনশীলতা, বুদ্ধি ও আবেগ মানুষকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব করে তুলেছে, তা যদি কোনো যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে মানুষের নিজস্বতা বলতে আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকবে?

তাই অনন্ত অবসরের এই লোভনীয় টোপ আসলে এক ভয়ঙ্কর মায়াজাল। কাজ শুধু রুটি-রুজি জোগায় না, মানুষকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার রসদও দেয়। তাই প্রযুক্তির উন্নয়ন হোক, কিন্তু তা যেন মানুষের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়। কারণ, সৃষ্টি আর শ্রমের মধ্যেই মানুষের সার্থকতা লুকিয়ে আছে, যন্ত্রের দেওয়া অলস অবসরে নয়।


