দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে বরফ গলল পশ্চিম এশিয়ায়। এক ঐতিহাসিক প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ আমেরিকা ও ইরান। পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ মধ্যস্থতায় তৈরি এই খসড়া অনুযায়ী, অবিলম্বে বন্ধ হচ্ছে সমস্ত সামরিক অভিযান এবং খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক মাধ্যমে এই চুক্তির কথা নিশ্চিত করে বিশ্বের সব জাহাজকে পুনরায় তাদের ইঞ্জিন চালু করার বার্তা দিয়েছেন। আগামী শুক্রবার, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলি যৌথ বাহিনীর ইরান আক্রমণের পর থেকেই পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। পাল্টা জবাবে তেহরানও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালীতে ‘মাইন’ বা সামুদ্রিক বোমা পেতে রাখে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও পণ্য পরিবহণ কার্যত থমকে যায়, যার বড় ধাক্কা লাগে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, শুক্রবার সই সম্পন্ন হলেই যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জলপথ থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং মাইন সরানোর কাজ শুরু হবে। নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রাম্প লিখেছেন, “সারা পৃথিবীর জাহাজ তাদের ইঞ্জিন চালু করে দিক। তেল পরিবাহিত হোক।”
এই চুক্তির খবরে বড় স্বস্তি পেয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে, এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক গোলযোগ তৈরি করেছিল। ভারত আশা করে, এই সমঝোতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অবাধ নৌপরিবহণ ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।
- সতর্ক তেহরান
চুক্তি সম্পন্ন হলেও মার্কিন প্রশাসনকে এখনই অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে নারাজ তেহরান। ইরানের উপবিদেশমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সাফ জানিয়েছেন, “এই সমঝোতার অর্থ শত্রুকে বিশ্বাস করা নয়।” তাঁর মতে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে আমেরিকা হরমুজ প্রণালীর অবরোধ পুরোপুরি তুলছে কি না এবং ইরানের আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক সম্পদ মুক্ত করছে কি না। পাশাপাশি, লেবাননসহ সমস্ত অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করার শর্তও জুড়ে দিয়েছে ইরান।
এদিকে, ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে যখন গোটা বিশ্ব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই বেঁকে বসেছে আমেরিকার পরম বন্ধু রাষ্ট্র ইজরায়েল। ট্রাম্পের এই চুক্তি মানতে তারা বাধ্য নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেল আবিব। ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, “ইজরায়েল আমেরিকার কোনো অঙ্গরাজ্য বা দুর্বল রাষ্ট্র নয়। নিজেদের সুরক্ষার সিদ্ধান্ত আমরা স্বাধীনভাবেই নেব।” লেবানন, গাজা ও সিরিয়ায় দখল করা প্রায় ১০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে সেনা সরাতে নারাজ ইজরায়েল। এই নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে চেয়েছেন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
আপাতত গোটা বিশ্বের নজর আগামী শুক্রবারের জেনেভা বৈঠকের দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনে, নাকি ইজরায়েলের আপত্তিতে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে—এখন সেটাই দেখার।


