শহুরে জীবনের একঘেয়েমি, গাড়ির হর্ন আর কংক্রিটের জঙ্গল থেকে কি একটু ছুটি চাইছেন? পুরুলিয়ার দেউলঘাটা (Deulghata) যেখানে কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায় হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের ফিসফিসানি, আপনার জন্য তেমনই এক আদর্শ গন্তব্য হতে পারে । কংসাবতী নদীর স্নিগ্ধ হাওয়া, জয়পুর অরণ্যের রহস্যময় নিস্তব্ধতা আর রাঢ় বাংলার লাল মাটির গন্ধ— সব মিলিয়ে এই জায়গাটি যেন এক অজানা জাদুকরী স্বর্গ। পুরুলিয়া শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়টি পর্যটকদের কাছে আজও সেভাবে পরিচিত নয়, আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে রয়েছে এর আসল রোমাঞ্চ!

আরও পড়ুন: ক্ষমতার মোহ না অন্য রহস্য? ২১ দিনের অজানা সত্য নিয়ে গান্ধীর চরিত্রে মনোজ বাজপেয়ী!
জৈন ও হিন্দু সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, পুরুলিয়া একসময় ছিল জৈন ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, জৈনদের ২৪তম তীর্থঙ্কর, স্বয়ং বর্ধমান মহাবীর তাঁর রাঢ়দেশ ভ্রমণের সময় বেশ কিছুদিন এই অঞ্চলে কাটিয়েছিলেন। প্রাচীন জৈন শাস্ত্র ‘আচারাঙ্গ সূত্র’ এবং ‘ভগবতী সূত্র’-তেও এর উল্লেখ রয়েছে। দশম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে ওঠা প্রায় ১৫টি প্রাচীন মন্দির ও ছোট ছোট সৌধের ধ্বংসাবশেষ আজও সেই সোনালি অতীতের গল্প বলে। একাদশ শতাব্দীতে রাজা অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গ দেবের পৃষ্ঠপোষকতায় এই মন্দিরগুলোর স্থাপত্য এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছিল। পরবর্তীতে দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ জৈন ধর্মের প্রভাব কিছুটা কমতে শুরু করলে, এখানে হিন্দু ধর্মের বিকাশ ঘটে।

জঙ্গলের বুকে যেন এক হলিউড থ্রিলার!
এই রোমাঞ্চকর জায়গাটির আবিষ্কারের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। ১৮৬৪-৬৫ সাল নাগাদ ছোটোনাগপুরের তৎকালীন ব্রিটিশ কমিশনার ই. টি. ডালটন গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তিনটি বিশাল আকারের মন্দির আবিষ্কার করেন। এরপর ১৮৭২-৭৩ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার জে. ডি. বেগলার এই মন্দিরগুলি থেকে অষ্টভুজা দুর্গা, গণেশ এবং চতুর্ভুজা পার্বতীর মতো অনবদ্য কিছু হিন্দু মূর্তির খোঁজ পান।

স্থাপত্যের এক অকল্পনীয় নিদর্শন
পুরুলিয়া-রাঁচি রোড থেকে একটি মেঠো পথ ধরে গড় জয়পুর গ্রামের দিকে এগোলেই চোখে পড়বে উঁচু ইটের গাঁথনি। জঙ্গলঘেরা এই ধ্বংসাবশেষের পরতে পরতে রয়েছে রাজকীয়তার ছোঁয়া। কালের নিয়মে অনেক মন্দির ধ্বংস হয়ে গেলেও, বর্তমানে দুটি মন্দির মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম মন্দিরটি প্রায় ৬০ ফুট উঁচু! ইটের দেওয়ালে বাংলার পাল ও সেন যুগের নিপুণ স্টাকো কারুকার্য, হাঁস ও পাতার স্ক্রলওয়ার্ক এবং ত্রিকোণ করবেলের কাজ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় মন্দিরটিও তার অপরূপ শিল্পকলা এবং গর্ভগৃহের গণেশ মূর্তির জন্য বিখ্যাত। নেপালি-হিন্দু চিত্রকলার আদলে তৈরি এখানকার দেবদেবীর মূর্তিগুলো সত্যিই বিরল। এছাড়া পাথরের তৈরি একটি মন্দির থেকে উদ্ধার হওয়া শিবলিঙ্গ প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে হিন্দুধর্ম কীভাবে তার শিকড় বিস্তার করেছিল।

কেন যাবেন দেউলঘাটায়?
আপনি যদি শুধুমাত্র পাহাড় বা সমুদ্রের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে, অজানা ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে চান, তবে এই জায়গাটি আপনাকে ডাকছে। প্রতিটি ইটের খাঁজে যেন লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতের এক না-বলা গল্প। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে, নিস্তব্ধ প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে এই স্থাপত্যগুলি আপনাকে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি দেবে।

ভ্রমণ নির্দেশিকা: কীভাবে সাজাবেন আপনার ট্রিপ?
- কীভাবে পৌঁছাবেন: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে চেপে সহজেই পুরুলিয়া পৌঁছানো যায়। এছাড়া সড়কপথে কলকাতা থেকে পুরুলিয়া যেতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা। পুরুলিয়া শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র ৩০ কিলোমিটার গেলেই পৌঁছে যাবেন স্বপ্নের দেউলঘাটায়(Deulghata) ।
- কোথায় থাকবেন: যেহেতু দেউলঘাটা (Deulghata) একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থান, তাই ঠিক মন্দির সংলগ্ন এলাকায় থাকার বা খাওয়ার কোনো আধুনিক ব্যবস্থা নেই। তবে চিন্তা নেই! আপনি পুরুলিয়া শহরে থাকতে পারেন। আর যদি প্রকৃতির আরও কাছাকাছি থাকতে চান, তবে অযোধ্যা পাহাড় বা বাঘমুন্ডির সুন্দর রিসর্টগুলো বেছে নিতে পারেন। অযোধ্যা পাহাড় থেকে দেউলঘাটার (Deulghata) দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার।

- যাওয়ার সেরা সময়: দেউলঘাটা ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে মার্চ মাস, বিশেষ করে শীতকালই হলো সেরা সময়। এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে। আর যদি ভ্রমণের সাথে সংস্কৃতির স্বাদ পেতে চান, তবে টুসু উৎসবের সময় এখানে আসুন। গ্রামীণ মানুষের ভিড়, স্থানীয় গান আর রঙের ছটায় তখন এই লাল মাটির দেশ এক অন্য রূপ ধারণ করে।
আরও পড়ুন: ব্রাজিলের কড়া স্ক্যানারে কলকাতা! যুবভারতীর মাঠ কি পাস করল কঠিন পরীক্ষা?
কংসাবতীর মৃদু জলধ্বনি আর শতাব্দীপ্রাচীন ইটের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা রহস্য— দেউলঘাটা কেবল এক পর্যটন ক্ষেত্র নয়, এটি ইতিহাসের বুকে এক নিঃশব্দ সফর। প্রাচীন ভারতের শিল্পকলা আর প্রকৃতির শান্ত সহাবস্থান অনুভব করতে আপনার পরবর্তী গন্তব্য হোক দেউলঘাটা (Deulghata) ।
