কৃষ্ণবর্ণা কালী নয়… ধবধবে সাদা রূপে এখানে বিরাজ করেন মা ! বাংলার বুকেই রয়েছে এমন এক কালীমন্দির (Rajballavi Temple), যেখানে প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে পূজিত হন শ্বেতকালী রাজবল্লভী (Shwet kali Rajballavi)।

সাধারণত চোখ বন্ধ করলেই কালীমায়ের যে রূপ ভেসে ওঠে— কৃষ্ণবর্ণা, খোলা চুল, উন্মুক্ত জিহ্বা, হাতে অস্ত্র। কিন্তু হুগলির রাজবলহাটে (Hooghly Rajbalhat) সেই চেনা ছবির বদলে দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য এক রূপ। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তি ধবধবে শুভ্র। ত্রিনয়না, দ্বিভুজা এই দেবীর রূপ আজও ভক্তদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়।
আরও পড়ুন – ১২ জ্যোতির্লিঙ্গ, দেশজুড়ে মহাদেবের মহিমা
কেন সাদা রঙের কালী?
শাক্ত সাধনার ধারায় কালীকে সাধারণত শক্তি, ধ্বংস ও অশুভ বিনাশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু রাজবল্লভী মাতার শুভ্র রূপের মধ্যে ভক্তরা খুঁজে পান শান্তি, জ্ঞান ও করুণার এক বিশেষ প্রকাশ।
হুগলির রাজবলহাট একসময় ছিল প্রাচীন ভূরশুট রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা সদানন্দ রায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর এই শক্তিপীঠের সূচনা করেন। যদিও এই কাহিনির সবটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়, তবে যুগের পর যুগ ধরে এটি মানুষের বিশ্বাসের অংশ হয়ে রয়েছে।

শুধু রং নয়, মূর্তিতেও রয়েছে চমক!
রাজবল্লভী মাতার বিগ্রহের পদস্থাপনও অন্য কালীমূর্তির থেকে আলাদা। ডান হাতে খড়্গ, যা অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক। বাম হাতে রয়েছে একটি পাত্র, যা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত। যেখানে অধিকাংশ কালীমূর্তিতে দেবীকে শিবের বুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, সেখানে এখানে দেবীর ডান পা ভৈরবের বুকে এবং বাম পা মহাদেবের মস্তকে স্থাপিত। এই বিরল মূর্তিতত্ত্ব শাক্ত ও তান্ত্রিক গবেষকদের কাছেও বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
আরও পড়ুন – ঋষিকেশে নতুন রোমাঞ্চ, গঙ্গার উপর কাঁচের সেতু
পুরীর জগন্নাথদেবের নবকলেবরের কথা অনেকেই জানেন, কিন্তু রাজবল্লভী মন্দিরেও দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিগ্রহ পরিবর্তনের প্রথা চলে আসছে। বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভক্তদের কাছে এটি দেবীর চিরনতুন শক্তির প্রতীক।
শুধু তাই নয়, রাজবল্লভী মন্দিরের দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। জলঘড়ির মাধ্যমে সময় নির্ধারণের পুরোনো রীতির স্মৃতিও এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ।
লোকবিশ্বাসে রাজবল্লভী মাতা অত্যন্ত জাগ্রত। বহু ভক্ত মানত পূরণ ও আশীর্বাদের আশায় এখানে আসেন। মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু বিরল লোকাচারও, যার মধ্যে তামাক বা হুকো নিবেদনের প্রথার কথাও প্রচলিত।
কালী মানেই শুধু কালো রূপ নয়— কখনও তিনি শুভ্র, শান্ত, আবার একই সঙ্গে শক্তির প্রতীক।



