Nepal Flash Flood Reason: ঝলমলে নীল আকাশ, মেঘভাঙা বৃষ্টির বিন্দুমাত্র পূর্বাভাস ছিল না। অথচ চোখের পলকে পাহাড়ের বুক চিরে ধেয়ে এল সাক্ষাৎ মৃত্যু! নেপালে হড়পা বান (Nepal Flash Flood) যেন এক লহমায় ধ্বংসপুরীতে পরিণত করেছে ছবির মতো সুন্দর এক দেশকে। এখনও পর্যন্ত ১৫৭ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে, নিখোঁজের সংখ্যা গুণতে গিয়ে শিউরে উঠছেন উদ্ধারকারীরা। চারদিকে শুধুই হাহাকার আর স্বজন হারানোর বুকফাঁটা কান্না। কিন্তু গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে— মেঘ না চাইতেই এই প্রলয়ংকরী ‘জলবোমা’ আচমকা ফাটল কোথা থেকে?

আরও পড়ুন: আধার জেরক্সের দিন শেষ! হোটেল চেক-ইনে আসছে ডিজিটাল ভেরিফিকেশন
ভূমিকম্প নয়, প্রলয়ের আসল খলনায়ক ‘তুষারধস’
প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে হওয়া ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পই বুঝি এই সর্বনাশের কারণ। মাটি কাঁপতেই হয়তো হিমবাহ ভেঙে পড়েছে নদীর বুকে! কিন্তু মার্কিন ভূতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (USGS) এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) সামনে আনল এক হাড়হিম করা তথ্য। কোনও ভূমিকম্প নয়, এই প্রলয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়াবহ তুষারধস বা আইস অ্যাভালাঞ্চ (Ice Avalanche) ।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগারের ব্যাখ্যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। তিনি উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে থাকা হিমবাহের একটি ২০০০ ফুট চওড়া বিশাল টুকরো সটান ৪ হাজার ফুট নীচে আছড়ে পড়ে। ভাবুন তো, পাহাড়ের চুড়ো থেকে এত বড় একটা বরফের চাঁই যদি আচমকা নীচে নদীর বুকে পড়ে, তার ধাক্কা কতটা ভয়ংকর হতে পারে! এ যেন এক শান্ত উপত্যকায় আচমকা প্রাণঘাতী ‘বম্বিং’।

কীভাবে তৈরি হল এই মারণ ‘জলবোমা’?
এই বিশাল আকারের হিমবাহটি যখন তিব্বতের লেন্ডে নদীতে এসে পড়ে, তখন বরফ, পাথর, কাদা আর জলের ভয়ংকর মিশ্রণ মুহূর্তের মধ্যে এক প্রাণঘাতী ‘জলবোমা’র আকার নেয়। পাহাড়ি নদীর খাড়াই ঢাল বেয়ে তা চোখের পলকে আছড়ে পড়ে নেপালের ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর বিজ্ঞানীদের মতে, এই জলোচ্ছ্বাসের বেগ এতই তীব্র ছিল যে গালচির কাছে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়!

নদীপাড়ের মানুষজন, সাধারণ গ্রামবাসী থেকে শুরু করে পর্যটকদের পালানোর বিন্দুমাত্র সুযোগটুকু দেয়নি খ্যাপা প্রকৃতি। নিখোঁজ প্রায় ৪৬৮ জন পর্যটকের মধ্যে রয়েছেন কৈলাস-মানস সরোবরগামী অনেক ভারতীয় দর্শনার্থীও। পুণ্যলাভের আশায় বেরিয়ে তাঁরা যে এমন এক মৃত্যুফাঁদে পা দেবেন, তা কে জানত!

প্রকৃতির রোষ নাকি মানুষের মাত্রাছাড়া লোভ?
এই ধ্বংসলীলার জন্য শুধু প্রকৃতিকে দুষলে কি দায় এড়ানো যাবে? পরিবেশবিজ্ঞানীরা একবাক্যে বলছেন— না। প্রথমত, বিশ্ব উষ্ণায়নের (Global Warming) ফলে হিমালয়ের বরফ গলছে দ্রুতগতিতে, যার দায় সম্পূর্ণভাবে মানুষের।

দ্বিতীয়ত, পাহাড়ি নদীর বুক চিরে যথেচ্ছভাবে তৈরি হওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। নেপালের এই ভয়াল হড়পা বানে (Nepal Flash Flood) ২০টি সেতুর পাশাপাশি অন্তত ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গিয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর বাঁধে আটকে থাকা বিপুল জলরাশি হড়পা বানের (Nepal Flash Flood) তেজ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলি বা ২০২৩ সালের সিকিমের বিপর্যয় ঠিক একই কারণে ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। নদীর প্লাবনভূমি বা রিভারবেড দখল করে গড়ে ওঠা বহুতলগুলো আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

ত্রাতা ভারত এবং আগামী দিনের সতর্কবার্তা
বিপদের এই চরম মুহূর্তে বন্ধু রাষ্ট্রের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে দিল্লির হিন্ডন এয়ারবেস থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার C-17 এয়ারক্রাফ্ট বিপুল ত্রাণ নিয়ে নেপালে পৌঁছেছে। তবে এই বিপর্যয় শুধু নেপালের নয়, আগামী দিনের জন্য এক বিরাট অশনি সংকেত। নেপালের জল নেমে এলে বিহার এবং উত্তরপ্রদেশেও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে, যার মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যে লাল সতর্কতা জারি করেছে।
আরও পড়ুন: নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি- প্রাণহানি
হিমালয়ের বুকে যে হারে বরফ গলছে, তাতে আগামী দিনে ভারত বা বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশগুলোতেও এমন প্রলয় নেমে আসতে পারে। মানুষের অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর প্রকৃতির নিয়মে হস্তক্ষেপ করার ফল যে কতটা মর্মান্তিক হতে পারে, নেপালের এই হড়পা বান (Nepal Flash Flood) তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবে ঠিকই, কারণ মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি কখনও হার মানে না। কিন্তু প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কবে সচেতন হব? কংক্রিটের জঙ্গল বানানোর দৌড়ে প্রকৃতির কান্না শোনার সময় কি এখনও আসেনি? সময় থাকতে সতর্ক না হলে, হয়তো আগামী দিনে আরও বড় কোনও বিপর্যয়ের মূল্য চোকাতে হবে মানবসভ্যতাকে।
