রেল চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদকে ঘিরে জোরাল আইনি লড়াইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। জীবিকা ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার শুনানিতে আপাতত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে আদালত।
বালিগঞ্জ, বামনগাছি, বারুইপুর, ডানকুনি, গুমা, বনগাঁ, দুর্গনগর, মথুরাপুর, যাদবপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় রেলের দেওয়া যে নোটিসগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে জুন মাস পর্যন্ত নতুন করে আগের নোটিস কার্যকর করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ফলে আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তাঁদের পরিবার।

মামলাকারীদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে বলেন, যেভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে, তাতে দেশের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার কেউই মানুষের জীবিকার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। জীবনের অধিকার এবং কর্মসংস্থানের অধিকার পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের মৌলিক অধিকার কোনও কারণ দেখিয়ে খর্ব করা যায় না। বরং তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং সহায়তা করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আরও পড়ুন – ‘গুনগুন করে মহুয়া’: উত্তম কুমার থেকে তরুণ মজুমদার, মহুয়ার বায়োপিকে চাঁদের হাট!
আদালতে তিনি আরও বলেন, ঠেলা গাড়ি, ঝুপড়ি দোকান বা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়েই মানুষ এই ধরনের ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। সেই মানুষদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা সরকারের কাজ হতে পারে না। তাঁর দাবি, রাষ্ট্র কখনও নাগরিকদের শত্রু হিসাবে আচরণ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ করে বুলডোজার নিয়ে গিয়ে দোকানপাট ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বহু এলাকায় উচ্ছেদের আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। তবুও তাঁরা উচ্ছেদ অভিযান থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আরও যুক্তি দেন, কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে রেলের জমিতে বসবাস বা ব্যবসা করে থাকেন এবং সেই সময়ে প্রশাসন কোনও বাধা না দেয়, তাহলে কয়েক দশক পরে হঠাৎ করে উচ্ছেদ করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি আদালতকে জানান, অতীতে পুলিশের সংগঠন সংক্রান্ত একটি মামলাতেও এই ধরনের আইনি যুক্তি কার্যকর হয়েছিল।

অন্যদিকে, মামলাকারীদের আর এক আইনজীবী ফিরদৌস শামিম আদালতে দাবি করেন, বহু ক্ষেত্রে রেলযাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্ম বা রেলের রাস্তার ধারে থাকা ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে বারুইপুর ও ডানকুনির উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, বারুইপুরে ১৯৯৫ সাল থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৪০টি পরিবারকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। ডানকুনিতে ৩২টি পরিবার একই ধরনের নোটিস পেয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, অনেক নোটিসে কোনও তারিখ বা স্বাক্ষর পর্যন্ত নেই, যা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
রেলের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী জানান, সংশ্লিষ্ট জমিগুলির মালিকানা রেলের। তাঁর দাবি, ১৮৮১ সালে জমি কেনার ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম মূল্য জমা দেওয়ার কথা ছিল, সেই বিষয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ সেই অর্থ জমা দেননি। সেই কারণেই উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি আদালতে জানান।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, রেলের জায়গা বা প্ল্যাটফর্ম দখল করে যদি দোকান বসানো হয়, তাহলে রেল কি তাঁদের সরাতে পারবে না? একইসঙ্গে তিনি এ-ও জানতে চান, যাঁদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে এবং যাঁদের রেল নিজেই ব্যবসার অনুমতি দিয়েছিল, তাঁদেরও কি উচ্ছেদ করা হয়েছে? আদালত এই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য চেয়ে রিপোর্ট তলব করেছে। রিপোর্ট জমা না পড়া পর্যন্ত এবং মামলার পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
হাই কোর্টের এই নির্দেশে আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন বালিগঞ্জ, বামনগাছি, বারুইপুর, ডানকুনি, গুমা, বনগাঁ, দুর্গনগর, মথুরাপুর, যাদবপুর-সহ একাধিক এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা, যাঁদের জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার উপরই নির্ভরশীল।



