গত কয়েক দিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী চিনির (Sugar) দাম। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম বাড়ায় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে, অন্যদিকে চিন্তার ভাঁজ মিষ্টি ও বেকারি ব্যবসায়ীদের কপালে। সামনে পুজোর মরশুম। এই সময়ে মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি ও বিভিন্ন বেকারি পণ্যের চাহিদা বাড়ে। ফলে চিনির দাম আরও বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসায়।
কিন্তু হঠাৎ চিনির (Sugar) দাম বাড়ছে কেন? বাজারে ঘুরছে একাধিক কারণের কথা। বিক্রেতা থেকে ব্যবসায়ী—অনেকেরই সন্দেহ, E20 পেট্রলের জন্য ইথানল উৎপাদন বাড়ায় আখের জোগানে টান পড়েছে। কারণ আখ থেকেই একদিকে চিনি, অন্যদিকে ইথানল তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ইথানল উৎপাদনকেই চিনির দাম বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আরও পড়ুন – খাবারেই চিনুন ভারতের বিভিন্ন শহর!
কী বলছেন বিক্রেতারা?

উত্তর ২৪ পরগনার মুদি ব্যবসায়ী অখিল কুণ্ডুর মতে, বাজারে জোগান কমেছে, অথচ চাহিদা রয়েছে। সেই কারণেই দাম বাড়ছে। দাম বাড়ায় অবশ্য ক্রেতাদের একাংশ কেনাকাটার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আর এক বিক্রেতা শিবশঙ্কর সাহা।
ওই জেলার ব্যবসায়ী ভবতোষ সাহার দাবি, গত ১০ দিনে প্রতি কেজি চিনির (Sugar) দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। তাঁর কথায়, উৎসবের মরশুমে চিনির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। ফলে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী দিনে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আর এক ব্যবসায়ী শুভেন্দু সাহার বক্তব্য, প্রতিদিনই চিনির (Sugar) দাম বাড়ছে। রাজ্যে পর্যাপ্ত জোগান না থাকাই এর অন্যতম কারণ বলে তাঁর দাবি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় মাসে পাইকারি বাজারেই প্রতি কেজি চিনির দাম প্রায় ১৫-১৬ টাকা বেড়েছে। বাইরে থেকে চিনি এনে এই ঘাটতি মেটানো গেলেও মিষ্টি তৈরির ক্ষেত্রে আমদানি করা চিনির মান নিয়ে সমস্যা হতে পারে বলেও দাবি তাঁর।
বেকারি শিল্পেও বাড়ছে উদ্বেগ
চিনির (Sugar) দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে ছোট ও মাঝারি বেকারি ব্যবসায়। ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের দাবি, চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই সমস্যায় পড়েছে বেকারি শিল্প।
সামনে দুর্গাপুজো, তার পরেই বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ। এই সময় কেক, পেস্ট্রি, কুকিজ-সহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের চাহিদা বাড়ে। ফলে উৎসবের মরশুমের ঠিক আগে চিনির (Sugar) দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচে বড়সড় প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
আরিফুল ইসলামের বক্তব্য, দেশে চিনি পর্যাপ্ত থাকার পরেও বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। E20 পেট্রলের জন্য ইথানল উৎপাদনে আখের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে চিনির জোগানের এই সমস্যার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
মিষ্টি ব্যবসায়ীদেরও মাথায় হাত
চিনির (Sugar) দাম এবং জোগান—দুই নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরাও। কেসি দাসের কর্ণধার ধীমান দাসের মতে, শুধু দাম বাড়ছে এমন নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিনি পাওয়াও যাচ্ছে না।
রাখি, জন্মাষ্টমী ও গণেশপুজোর হাত ধরে ইতিমধ্যেই উৎসবের মরশুম শুরু হয়েছে। সামনে দুর্গাপুজো, তার পর বিয়ের মরশুম। ফলে এই সময়ে চিনির (Sugar) জোগান স্বাভাবিক না থাকলে মিষ্টি ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ধীমান দাসের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতি কেজি চিনি ৪৩-৪৫ টাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। কিন্তু হঠাৎ এক মাসের মধ্যে এতটা পরিবর্তন কেন হল, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে। ইথানল তৈরিতে আখের ব্যবহার বাড়ার কারণেও চিনির জোগানে টান পড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
চিনির (Sugar) দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। কেন্দ্রের কাছেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
ইথানলের জন্যই কি বাড়ছে চিনির দাম?
E20 পেট্রলের জন্য ইথানলের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র ইথানল উৎপাদনের কারণেই চিনির (Sugar) দাম বাড়ছে—এমনটা মনে করছেন না ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডের প্রাক্তন সিনিয়র এগজিকিউটিভ এবং এনার্জি পলিসি ও বিকল্প জ্বালানি গবেষক সমীরণ মজুমদার।
তাঁর মতে, চিনির বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি সাধারণত আগে থেকেই ইথানল কেনার জন্য চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, মোট ইথানলের একটি বড় অংশ ভুট্টাজাতীয় শস্য থেকে সংগ্রহ করার কথা রয়েছে। ফলে ইথানলের জন্য আখের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা নেই।
এ ছাড়া শুধু আখের রস থেকেই যে ইথানল তৈরি হয়, তা নয়। আখের ছিবড়ে, চালের খুদ-সহ বিভিন্ন উৎস থেকেও ইথানল তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাহলে চিনির বাজারে টান কেন?

অন্যদিকে, ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের একটি অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভারতের চিনি (Sugar) উৎপাদন দেশের স্বাভাবিক চাহিদা মেটানোর মতো হলেও উৎসবের মরশুমে পরিস্থিতি বদলে যায়।
পুজো, উৎসব এবং পরবর্তী বিয়ের মরশুমে মিষ্টি ও বেকারি পণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে চিনির অতিরিক্ত চাহিদার সঙ্গে বাজারের জোগান তাল মেলাতে না পারলেই দাম বাড়তে পারে। ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের একটি অংশ সরিয়ে নেওয়া হলে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজারের একাংশ।
অর্থাৎ, চিনির (Sugar) দাম বৃদ্ধির পিছনে ইথানল একটি কারণ কি না, তা নিয়ে এখনও মতভেদ রয়েছে। তবে জোগান-চাহিদার ভারসাম্যহীনতা যে বাজারে চাপ তৈরি করেছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
আরও পড়ুন – হেলথ চেকআপ করছেন তো? বিপদ কিন্তু চুপিসারে আসে
এখন প্রশ্ন, উৎসবের মরশুমে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হবে কি না। সাধারণ মানুষের পকেটের চাপ কমাতে এবং মিষ্টি ও বেকারি শিল্পকে স্বস্তি দিতে সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করে কি না, নজর থাকবে সে দিকেই।
