উৎসবের মরশুম হোক বা সপ্তাহের শেষ দিন—ব্যস্ত, ভিড়ে ঠাসা বাজারে একদিকে মানুষের গিজগিজে ভিড়, অন্যদিকে ভাঙাচোরা বা হকারদের দখলে চলে যাওয়া ফুটপাত। তার ওপর দু-হাতে ভারী শপিং ব্যাগ আর কোলের শিশুর প্র্যাম সামলাতে গিয়ে ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা। চেনা ছবি, তাই তো? কিন্তু ভাবুন তো, যদি এমন কেউ থাকত, যে আপনার সব ব্যাগ বয়ে দিত, ভিড়ের মধ্যে চটজলদি দোকান খুঁজে দিত, আর আপনি শুধু নিশ্চিন্তে কেনাকাটা করতেন? ঠিক এই চেনা সমস্যাকে পুঁজি করেই দিল্লির বুকে জন্ম নিয়েছে এক অভিনব স্টার্ট-আপ— ‘ক্যারি-ম্যান’ (CarryMen)।

দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত লাজপত নগর বাজারে পা রাখলেই এখন চোখে পড়ছে কমলা আর সাদা রঙের একটি কিওস্ক(Kiosk)। দুই তরুণী মা— ঋতু কন্দারি শ্রীবাস্তব এবং কণিষ্কা মালহোত্রার মস্তিষ্কপ্রসূত এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। খোলা বাজারের ভাঙাচোরা ফুটপাথ আর উপচে পড়া ভিড়ে নিজেদের বাচ্চাদের প্র্যাম সামলাতে গিয়েই এই দুই বন্ধুর মাথায় আসে চমৎকার এই আইডিয়াটি। মাত্র ৭৯ টাকায় ৩০ মিনিট এবং ১৪৯ টাকায় এক ঘণ্টার জন্য এখানে ভাড়া করা যাচ্ছে একজন ‘শপিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’। আপনার শপিং ব্যাগ বওয়া, রোদে ছাতা ধরা, বাচ্চার প্র্যাম ঠেলে দেওয়া থেকে শুরু করে ফুড কোর্টের লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার এনে দেওয়া— সব দায়িত্বই এখন তাদের।
আরও পড়ুন – মাত্র ৪৮৯ টাকায় ৭৭ দিনের রিচার্জ! এয়ারটেলের প্ল্যানে মিলবে একগুচ্ছ সুবিধা

শুনতে চমৎকার লাগলেও এই পরিষেবা ঘিরেই এখন দু’ভাগে বিভক্ত নেটদুনিয়া। একদল মানুষ যখন একে শহুরে বেকারত্ব দূরীকরণের এক দুর্দান্ত ও সৃজনশীল হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন, অন্যদল তখন তুলছেন ‘বাবুয়ানি’ বা সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে এটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর ‘গ্লোরিফায়েড কুলি’ প্রথা, যা গিগ ইকোনমির কর্মীদের আরও বেশি শোষণের মুখে ঠেলে দেবে।

তবে এই সমস্ত বিতর্ককে উড়িয়ে দিয়েছেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতারা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এটি কোনো দাসত্ব নয়; বরং এখানে কর্মীরা স্থায়ী বেতনের চাকরি করছেন এবং সম্পূর্ণ সসম্মানে কাজ করছেন। বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে, এই পরিষেবার মূল গ্রাহক কোনো বিলাসী সমাজ নয়, বরং গর্ভবতী নারী, প্রবীণ নাগরিক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীরা, যাঁদের জন্য এই ভিড়ে একাকী চলাফেরা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ। ১৮ বছর বয়সী আনন্দ, যিনি বর্তমানে ‘ক্যারি-ম্যান’ হিসেবে কর্মরত, জানালেন যে আগের চেয়ে এই কাজে তিনি অনেক বেশি সম্মান ও ভালো বেতন পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন – এক ফোঁটা রক্তেই হবে ১০ ক্যানসারের ঝুঁকি শনাক্ত!
দিল্লির লাজপত নগরের পর এবার চাঁদনি চকের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারেও ডানা মেলতে চলেছে এই স্টার্ট-আপ। তবে শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসা বড় করার সাথে সাথে কর্মীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখাই হবে এই সংস্থার আসল পরীক্ষা। পুঁজিবাদের বাজারে এই মানবিক ও অভিনব উদ্যোগ কতদিন তার গুণগত মান ধরে রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার।



