টলিপাড়ায় নতুন বিতর্ক! কনফেডারেশন গঠনের আগেই শ্যুটিং সংক্রান্ত নির্দেশিকা, প্রশ্নের মুখে কর্তৃত্ব টলিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় গত কয়েক মাস ধরে চলা সাংগঠনিক অস্থিরতা, ক্ষমতার সমীকরণ বদলের জল্পনা এবং ফেডারেশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সামনে এল নতুন রহস্য। শ্যুটিং সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র চর্চা। কারণ, এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত না হওয়া Eastern India Motion Pictures & Cultural Confederation (EIMPCC)-এর নাম ব্যবহার করে জারি হয়েছে একটি ই-মেল বিজ্ঞপ্তি, যার বৈধতা ও কর্তৃত্ব নিয়েই উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
ভাইরাল হওয়া ওই ই-মেলে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে টলিগঞ্জের শ্যুটিং সংক্রান্ত অনুমতি, যোগাযোগ ও কাজের যাবতীয় বিষয় নির্দিষ্ট একটি ই-মেল আইডির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। সেখানে eimpcc2020@gmail.com-কে সরকারি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্দেশিকা জারি করল কে? কোন কর্তৃত্বে তা করা হল? এবং এর পিছনে কোনও সরকারি বা প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না।
বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে কারণ কয়েকদিন আগেই টালিগঞ্জের বিজেপি বিধায়িকা পাপিয়া অধিকারী প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেডারেশন বা Federation of Cine Technicians and Workers of Eastern India (FCTWEI)-এর কার্যকর ভূমিকা আর নেই। ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস বর্তমানে জেল হেফাজতে থাকায় সংগঠনের পুরনো কাঠামোও কার্যত অচল বলে দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, পাপিয়া অধিকারী যে নতুন সংগঠন EIMPCC গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটিও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেনি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। ফলে এমন পরিস্থিতিতে কনফেডারেশনের নাম ব্যবহার করে শ্যুটিং সংক্রান্ত নির্দেশ জারি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কাছে কোনও তথ্য নেই। ফলে বিতর্ক আরও বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৮ জুন নবান্নে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে টলিগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন টলিগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার বিধায়ক—রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ চট্টোপাধ্যায় এবং পাপিয়া অধিকারী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব শান্তনু বসু এবং প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। বৈঠকের পর সামাজিক মাধ্যমে একাধিক পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় টলিপাড়ায় আর কোনও ‘দাদাগিরি’ চলবে না এবং শিল্পী, কলাকুশলী, টেকনিশিয়ান ও প্রযোজকদের নিয়ে নতুন কনফেডারেশন গঠনের পথে এগোচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি। সেই পোস্টারগুলিতে পাপিয়া অধিকারীর ভূমিকাকেও তুলে ধরা হয়।
আসলে এই বিতর্কের সূত্রপাত ৩ জুন টেকনিশিয়ান স্টুডিও প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সভা থেকে। সেখানেই পাপিয়া অধিকারী প্রথমবার EIMPCC গঠনের প্রস্তাব সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাংলা বিনোদন জগতকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও কর্মমুখী কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে নতুন সংগঠন প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করেন, একটি শ্যুটিং ইউনিটে কতজন কর্মী প্রয়োজন হবে, সেই সিদ্ধান্ত প্রযোজক ও এক্সিকিউটিভ প্রযোজকরাই নেবেন, অন্য কোনও সংগঠন নয়।
তবে এই প্রস্তাব ইন্ডাস্ট্রির একাংশে সমর্থন পেলেও অন্য অংশে প্রবল আপত্তির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ২৬টি গিল্ডের পরিবর্তে সীমিত সংখ্যক গিল্ড রাখার প্রস্তাব ঘিরে টেকনিশিয়ানদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, একটি সভায় ডিম ও ইট ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যখন ফেডারেশন বিলুপ্তির কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি এবং কনফেডারেশনও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়নি, তখন FCTWEI-এর নাম ও যোগাযোগের তথ্য ব্যবহার করে EIMPCC-র তত্ত্বাবধানে কাজের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে কীভাবে? কে বা কারা এই কর্তৃত্ব দেখাচ্ছে, তা নিয়েই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে টলিপাড়ায়।যদিও এ বিষয়ে পাপিয়া অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনও স্পষ্ট মন্তব্য করতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা না করে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। আলোচনার পরই তিনি বিস্তারিত জানাবেন।


