সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই অবিন্যস্ত আঙুলে ফেসবুক স্ক্রল করা, কিংবা অলস দুপুরে ইনস্টাগ্রামে রিলসের সাগরে ডুব দেওয়া— এ যেন আমাদের রোজকার জীবনের ডিজিটাল অক্সিজেন। কিন্তু ভাবুন তো, যদি হঠাৎ একদিন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে টাকা দেওয়ার বার্তা? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই এখন রূঢ় বাস্তব। এতদিন যে সোশ্যাল মিডিয়াকে আমরা সম্পূর্ণ ‘বিনামূল্যে’ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলাম, তার চেনা সুদিন এবার ফুরিয়ে এল বলে! বিনামূল্যে সমাজমাধ্যমের দুনিয়ায় এক নিঃশব্দ বিপ্লব নিয়ে আসছে মার্ক জুকারবার্গের সংস্থা ‘মেটা’। দীর্ঘদিনের ‘ফ্রি’ জমানার অবসান ঘটিয়ে এবার ধাপে ধাপে পেইড সাবস্ক্রিপশনের দিকে হাঁটছে এই টেক জায়ান্ট।
আরো পড়ুন: রোনাল্ডো – ই ভরসা, বিশ্বকাপ জয়েই মার্টিনেজের নজর!
বিজ্ঞাপনের চেনা ছক ভেঙে এবার ‘পেইড সাবস্ক্রিপশন’ বা প্রিমিয়াম পরিষেবার দুনিয়ায় পা রাখছে মার্ক জুকারবার্গের সংস্থা। ইতিমধ্যেই ভারতীয় ব্যবহারকারীদের একাংশের হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে উঁকি দিতে শুরু করেছে অ্যাপগ্রেডের অফিশিয়াল নোটিফিকেশন। সম্প্রতি অনেক ব্যবহারকারী হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েবে লগ-ইন করার সময় একটি বিশেষ আপগ্রেডের বার্তা দেখতে পাচ্ছেন। এটি কোনো থার্ড-পার্টি বা ভুয়া অ্যাপ নয়, বরং অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপেরই প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন পরিষেবা। এর মাধ্যমে চ্যাট ম্যানেজমেন্ট ও অতিরিক্ত কাস্টমাইজেশনের মতো বিশেষ কিছু ফিচার আনলক করা যাবে। অর্থাৎ, চেনা মেসেজিং অ্যাপটি এবার রূপ পাল্টাচ্ছে।
প্রাথমিক স্তরে ভারতে তিনটি মূল অ্যাপের জন্য মেটা নিয়ে এসেছে বিশেষ পেইড প্ল্যান— WhatsApp Plus, Facebook Plus এবং Instagram Plus। ভারতের বাজারে মাত্র ৯৯ টাকার মাসিক খরচে মিলবে এই ‘প্লাস’ সুবিধা। এমনকি প্রথম ছয় মাসের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ প্লাসে থাকছে ৫০ শতাংশ ছাড়ের আকর্ষণীয় অফার। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়; যারা মূলত ‘পাওয়ার ইউজার’ বা এআই-প্রেমী, তাদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে আসছে ‘মেটা ওয়ান প্লাস’ (মাসিক প্রায় ৭৭৫ টাকা) এবং ‘মেটা ওয়ান প্রিমিয়াম’ (মাসিক প্রায় ১,৯৩৯ টাকা)-এর মতো রাজকীয় প্ল্যান। বাড়তি চ্যাট পিন করার সুবিধা, এক্সক্লুসিভ প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ম্যাজিক মিলবে এই প্রিমিয়াম প্যাকেজে।
আরো পড়ুন: অটো থেকে রোলস রয়েস: ৯০০ কোটির সাম্রাজ্য গড়ার ‘বিন্দু’ রূপকথা
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুই দশক ধরে বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়ার পর হঠাৎ কেন এই ভোলবদল? উত্তর লুকিয়ে আছে মেটার ভবিষ্যতের ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসীম ক্ষুধার মধ্যে। প্রযুক্তির দুনিয়ায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে মেটা এখন জলপ্রপাতের মতো টাকা ঢালছে এআই গবেষণায়। চলতি ২০২৬ সালে মেটার এআই সংক্রান্ত মূলধনী খরচ দাঁড়াতে পারে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা এককথায় বিপুল।
এই এআই যুদ্ধজয় করতে ‘স্কেল এআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ওয়াং-কে নিজেদের সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবের প্রধান হিসেবে নিয়ে এসেছেন জুকারবার্গ। পাশাপাশি ভারতের বুকেও রিলায়েন্সের হাত ধরে গুজরাটের জামনগরে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল এআই ডেটা সেন্টার।
এতদিন মেটার মোট আয়ের প্রায় ৯৭.৬ শতাংশই আসত কেবল বিভিন্ন সংস্থার বিজ্ঞাপন থেকে। কিন্তু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-এর এই খরচের মহাসমুদ্র কেবল বিজ্ঞাপনের নৌকায় পার করা দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব। তাই আয়ের বিকল্প ও স্থায়ী উৎস হিসেবে সাবস্ক্রিপশন মডেলকে হাতিয়ার করছে মেটা। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর অনুমান, এই নতুন পথ ধরে আগামী দিনে মেটার ঘরে বছরে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে।
বিনামূল্যের আদিম ধারণা থেকে টাকা খরচের কর্পোরেট দুনিয়ায় মেটার এই রূপান্তর আসলে এক নতুন যুগের সূচনা। টাকা দিয়ে অতিরিক্ত প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন বা উন্নত এআই টুল সাধারণ মানুষ কতটা আপন করে নেবেন, তা সময়ই বলবে।


