ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তখন একের পর এক হিট ছবি উপহার দিচ্ছেন অপর্ণা সেন (Aparna Sen) । গ্ল্যামার দুনিয়ায় অভিনেত্রী হিসেবে তিনি রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত ও চর্চিত। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর মনে হলো, ক্যামেরার পিছনের কারিগর হবেন তিনি। সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) ও অপর্ণা সেন (Aparna Sen)—ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই দুই কিংবদন্তির সম্পর্ক যে কতটা গভীর ছিল, তা সিনেপ্রেমীদের অজানা নয়। তবে জানেন কি, জীবনের এই বিশাল পালাবদলের সময় অস্কারজয়ী স্রষ্টার করা মাত্র একটি প্রশ্ন কীভাবে চিরতরে বদলে দিয়েছিল এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর চিন্তাভাবনা?

আরও পড়ুন: রাত পোহালেই বড় চমক! ‘দেশু ৭’ নিয়ে ফের সারপ্রাইজ দেব-শুভশ্রীর
সালটা ১৯৮১। মনের মধ্যে একরাশ স্বপ্ন আর ভয় নিয়ে অপর্ণা সেন (Aparna Sen) লিখে ফেলেছেন তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর চিত্রনাট্য। কিন্তু মনে হাজারো দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে একটি ইংরেজি ভাষার চিত্রনাট্য ভারতীয় দর্শক কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে চরম সংশয়ে ভুগছিলেন তিনি। সেই সময় তাঁর মানসিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠেন ‘পথের পাঁচালী’র বিশ্ববরেণ্য স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) । চিত্রনাট্যটি মন দিয়ে পড়ার পর তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “খুব সুন্দর লিখেছ। লেখাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রাণ আছে। এখনই ছবিটা বানিয়ে ফেলো।” গুরুর কথায় সাহস তো পেলেন, কিন্তু প্রযোজক কোথায়? সেই মুশকিল আসানও করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ। তাঁরই ব্যক্তিগত পরামর্শে প্রযোজক হিসেবে শশী কাপুরের সঙ্গে কথা বলেন অপর্ণা (Aparna Sen) । আর এভাবেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

তবে আসল গল্পটা শুরু হয় ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পর। সম্পাদনা ও অন্যান্য কাজ যখন প্রায় শেষের পথে, তখন গুরুকে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন এই নবাগতা পরিচালক। বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, “ছবিটা শেষ তো করলাম, তবে বোধহয় অনেক টেকনিক্যাল ভুলভ্রান্তি থেকে গেল।” ঠিক সেই মুহূর্তে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাঁকে থামিয়ে দিয়ে এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আজীবন গেঁথে যায় অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) মনে।
স্নেহমাখা কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “ভুল আছে, জানি। কিন্তু প্রথম ছবি থেকে তুমি আর কী প্রত্যাশা করো? শুধু একটা কথা বলো, কোনও ‘মুহূর্ত’ তৈরি করতে পেরেছ কি?”

এই একটা ছোট্ট প্রশ্ন! আর তাতেই যেন মুহূর্তে কেটে যায় অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) সমস্ত সংশয়। তিনি সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, সিনেমা মানে কেবল ব্যাকরণ মেনে নিখুঁত টেকনিক্যাল শটের পর শট সাজানো নয়। সিনেমা হলো সেই অবর্ণনীয় অনুভূতির নাম, সেই জাদুকরী মুহূর্তের সমষ্টি, যা সরাসরি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং হল থেকে বেরিয়েও যা তাঁরা আজীবন বুকে লালন করেন। শিল্পের এর চেয়ে সহজ অথচ গভীর সংজ্ঞা আর কী হতে পারে!
আরও পড়ুন: বেবি সানস্ক্রিনের ক্ষেত্রে এই ভুল একবারেই নয়
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে ‘তিন কন্যা’ ছবির হাত ধরে এই সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) হাত ধরেই সেলুলয়েড দুনিয়ায় অভিনয়ে পা রেখেছিলেন এক লাজুক কিশোরী অপর্ণা। আর কে জানত, সেই মানুষটিই একদিন তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা পরিচালকের আসনে বসতে সবচেয়ে বড় প্রেরণা জোগাবেন! সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) কাছে কেবল একজন পরিচালক বা মেন্টর ছিলেন না, ছিলেন এমন এক পরম বন্ধু যিনি বারবার তাঁকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। সেদিন গুরুর দেওয়া সেই ‘মুহূর্ত’ তৈরির অমোঘ পাঠই আজও অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) প্রতিটি ছবিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অনুপ্রেরণার এই অনবদ্য গল্প আজও বহু তরুণ চিত্রনির্মাতাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
