১৯ বছরের প্রতীক্ষার অবসান! অবশেষে দর্শকদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পর্দায় মুক্তি পেয়েছে আওয়ারাপন ২ (Awarapan 2) । ২০০৭ সালের সেই আইকনিক কাল্ট ক্লাসিকের ম্যাজিক কি আবারও রূপালি পর্দায় ফিরল? এক কথায় বলতে গেলে— হ্যাঁ, ফিরেছে, এবং তা আরও বড়, আরও আকর্ষণীয় ও গ্র্যান্ড রূপে! ইমরান হাশমি অভিনীত এই সিক্যুয়েলটি কেবল দর্শকদের পুরনো স্মৃতিই উসকে দিচ্ছে না, বরং বক্স অফিসে রীতিমতো আয়ের সুনামি বইয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: সব সময় ‘ভালো থাকার’ চাপ আপনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে! আসল পজিটিভিটি আসলে কী?
গল্পের প্রেক্ষাপট: পুরনো শোক, নতুন মিশন
পুরো গল্পের গভীরে না গিয়ে, শুধু এটুকু বলা যায় যে, প্রথম পর্বের ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। আমাদের প্রিয় অ্যান্টি-হিরো ‘শিবম পণ্ডিত’ (ইমরান হাশমি) এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে অবসর নেওয়া এক মানুষ। নিজের হারানো ভালোবাসা আলিয়ার শোক বুকে নিয়ে এক নির্জন ও বিষণ্ণ জীবন কাটায় সে। কিন্তু ভাগ্য তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। এক অসহায় শিশুকে পাচারকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে তাকে পাড়ি দিতে হয় থাইল্যান্ডের নিয়ন আলোয় মোড়া অন্ধকার জগতে। ইন্টারপোলের এক গোপন মিশনে গিয়ে শিবম জড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর এক মাফিয়া পরিবারের সঙ্গে। শুরু হয় এক নতুন লড়াই— নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই।
চরিত্র বিশ্লেষণ: কে কতটা নজর কাড়ল?

- শিবম পণ্ডিত (ইমরান হাশমি): আগের সিনেমায় শিবম ছিল একজন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, নাস্তিক গ্যাংস্টার। এই নতুন কিস্তিতে শিবম যেন আরও পরিণত, প্রায় অমর এক ‘ডার্ক ভিজিল্যান্ট’ বা রক্ষাকর্তা। তার চোখে-মুখে আজও সেই পুরনো বিষণ্ণতা লেগে আছে, তবে অ্যাকশনের ক্ষেত্রে সে এবার রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। ইমরান হাশমি নিজের সেরাটা দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কেন এই ধরনের চরিত্রে তিনি বলিউডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা।

- জোরাওয়ার (পূরণ গাব্বি): ছবির অন্যতম বড় চমক হলেন মূল ভিলেন জোরাওয়ার। অত্যন্ত নিষ্ঠুর, সাইকোপ্যাথিক অথচ দারুণ স্টাইলিশ এই চরিত্রে পূরণ গাব্বি রীতিমতো পর্দা কাঁপিয়েছেন। তার বাচনভঙ্গি এবং উন্মাদনা দেখে আপনার হলিউড মুভির সাইকোপ্যাথ ভিলেনদের কথা মনে পড়তে বাধ্য।

- জারা (দিশা পাটানি): ছবিতে গ্ল্যামার এবং ইমোশনাল ব্যালেন্স দারুণভাবে বজায় রেখেছেন দিশা। তার চরিত্রটির স্ক্রিন প্রেজেন্স দুর্দান্ত এবং শিবমের এই রক্তক্ষয়ী ও রুক্ষ জীবনে সে যেন এক পশলা শান্তির বাতাস।

- নাফিসা নওয়াজ (শাবানা আজমি): কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা আজমি নিজের অনবদ্য অভিনয় দিয়ে এই অ্যাকশন-প্যাকড ছবিতে এক আলাদা গাম্ভীর্য নিয়ে এসেছেন। যদিও স্ক্রিনে তার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম সময়ের জন্য, তবুও শক্তিশালী সংলাপ এবং এক্সপ্রেশন দিয়ে প্রতিটি দৃশ্যেই তিনি নিজের জোরালো ছাপ রেখে গেছেন।
Awarapan বনাম Awarapan 2: কী কী বদল এল?
প্রথম ছবির সঙ্গে ‘আওয়ারাপন ২’ (Awarapan 2)-এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এর ক্যানভাস। ২০০৭ সালের গল্পটি আবর্তিত হয়েছিল একটি পাকিস্তানি জুটিকে বাঁচানোর লড়াইয়ের ওপর। কিন্তু এবার শিবের মিশন আরও বৃহত্তর, আরও আন্তর্জাতিক।

থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্কক শহরের নিয়ন আলোয় মোড়া অন্ধকার জগতে শিশু পাচারের মতো এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে আবর্তিত হয়েছে এবারের গল্প। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধারালো, রক্তক্ষয়ী এবং আধুনিক। তবে অ্যাকশনের ভিড়েও সিনেমাটি তার মূল মন্ত্র— “একটি নিরীহ প্রাণকে বাঁচানো মানে সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচানো”— ভুলে যায়নি।
মিউজিক: পুরনো সুরের জাদুকরী নস্টালজিয়া
‘আওয়ারাপন’ (Awarapan) মানেই গানের এক মায়াবী জগত। সিক্যুয়েলেও সেই ধারা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ‘তো ফির আও’ বা ‘তেরা মেরা রিশতা’-র মতো আইকনিক গানগুলো যেভাবে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা আপনার গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। একটি বিশেষ অ্যাকশন দৃশ্যে যখন ‘তেরা মেরা রিশতা’-র হুক লাইনটি বেজে ওঠে, তখন সিনেমা হলে দর্শকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখার মতো। এই ছবি প্রমাণ করে দিল, মিউজিক কীভাবে একটা সিনেমার প্রাণভোমরা হয়ে উঠতে পারে।

চিত্রনাট্যে কিছু দুর্বলতা বা অনুমানযোগ্য মোড় থাকলেও, ইমরান হাশমির ক্যারিশমা এবং ছবির দুরন্ত পেসিং সব ত্রুটি ঢেকে দিতে সফল হয়। বক্স অফিসে মুক্তির পর থেকেই ছবিটি দারুণ সাড়া ফেলেছে এবং দর্শকদের উন্মাদনা প্রমাণ করে যে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির জাদু এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
বক্স অফিস কালেকশন
মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে রীতিমতো তাণ্ডব চালাচ্ছে আওয়ারাপন ২ (Awarapan 2) । সানি দেওলের বহু চর্চিত ‘বাটোয়ারা ১৯৪৭’-এর মতো বড় ছবির সাথে বক্স অফিস ক্ল্যাশে নেমেও সগৌরবে রাজত্ব করছে শিব পণ্ডিত। মাত্র চার দিনেই ভারতে ৯১ কোটি টাকার নেট কালেকশন করে ফেলেছে মাত্র ৪৫ কোটি টাকা বাজেটের এই ছবি! অন্যদিকে সানির ছবি প্রথম তিন দিনে মাত্র ৭ কোটির গণ্ডি পেরিয়েছে। আয়ের এই গ্রাফ বুঝিয়ে দিচ্ছে, দর্শক কতটা মুখিয়ে ছিল এই কামব্যাকের জন্য।

কেন দেখবেন ছবিটা?
প্রথম ছবির সেই ধর্মীয় প্রেক্ষাপটকে সরিয়ে রেখে এবার গল্পকে সাজানো হয়েছে অনেক বেশি সর্বজনীন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে মুখ্য বিষয় হলো নিষ্পাপ শিশুদের রক্ষা করা। বিষ্ণু রাওয়ের দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি ব্যাংককের অলিগলি এবং রাজস্থানের রুক্ষ সৌন্দর্যকে নিখুঁতভাবে ফ্রেমবন্দি করেছে।
আরও পড়ুন: ‘স্বপ্ন বনাম ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স’! অর্থের চাপে কেন পিছিয়ে যাচ্ছে বিয়ে, সন্তান, কেরিয়ার?
তাই আপনি যদি ইমরান হাশমির সেই ২০০০-এর দশকের সোনালী যুগ মিস করে থাকেন, তবে এই ছবি আপনার জন্য ‘মাস্ট-ওয়াচ’। টানটান উত্তেজনা, চোখ ধাঁধানো সিনেমাটোগ্রাফি, দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আর ইমরান হাশমির সেই সিগনেচার ‘সোয়াগ’— সবকিছু মিলিয়ে ‘আওয়ারাপন ২’ (Awarapan 2) একটি নিখুঁত পয়সা-উসুল এন্টারটেইনার। কোনো স্পয়লার ছাড়াই বলছি, ছবির ক্লাইম্যাক্স আপনাকে এমন এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দেবে, যা নিয়ে আপনি হল থেকে বেরিয়েও বন্ধুদের সাথে আলোচনা করবেন। তাই আর দেরি না করে এই উইকেই বড় পর্দায় উপভোগ করে আসুন ‘আওয়ারাপন ২’ (Awarapan 2)।


