HomeবিনোদনRaja Sen: ক্যামেরার লেন্সে নয়, মন দিয়ে মানুষ পড়তেন! স্বার্থপর ইঁদুরদৌড়ের মাঝে...

Raja Sen: ক্যামেরার লেন্সে নয়, মন দিয়ে মানুষ পড়তেন! স্বার্থপর ইঁদুরদৌড়ের মাঝে এক বিরল ‘সন্ন্যাসী’ ছিলেন রাজা সেন

- Advertisement -spot_img

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নেমে এল এক গভীর শোকের ছায়া। রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রয়াত পরিচালক রাজা সেন (Raja Sen) । বয়স হয়েছিল প্রায় ৭১ বছর। সম্প্রতি বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর চোট পান বর্ষীয়ান এই পরিচালক। প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাঁকে এসএসকেএমে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে কিডনির সমস্যাও শুরু হয় এবং তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: যে হলগুলিতে আটকে কলকাতার নস্টালজিয়া!

সাদামাটা গল্পের এক জাদুকর

রাজা সেন (Raja Sen) মানেই বাঙালির কাছে এক নস্টালজিয়া। ১৯৮৭ সালে তাঁর পরিচালিত ‘সুবর্ণলতা’ ধারাবাহিক বাঙালি দর্শকদের ড্রয়িংরুমে এক বিপ্লব এনেছিল। এরপর ১৯৯৬ সালে তাঁর পরিচালিত ‘দামু’ সেরা শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার ছিনিয়ে নেয়। জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চনকে নিয়ে তৈরি ‘দেশ’, কিংবা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘দেবীপক্ষ’— তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একের পর এক কালজয়ী কাজ। এমনকি কমার্শিয়াল নায়ক জিৎ-কেও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ছবিতে এক অন্য রূপে দর্শকদের সামনে হাজির করেছিলেন তিনিই। সুদীর্ঘ কেরিয়ারে তিনবার জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

একরাশ আক্ষেপ আর না-বলা গল্প

“আমি আবার পরিচালনায় ফিরতে চাই… কিন্তু কোনো প্রযোজক পাচ্ছি না।” মাত্র এক বছর আগে এই আক্ষেপের সুর শোনা গিয়েছিল তাঁর গলায়। ‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’ কিংবা ছোটপর্দার কালজয়ী ‘সুবর্ণলতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর মতো অসামান্য সৃষ্টির কারিগর তিনি। অথচ জীবনের শেষ দিনগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে লিখতে হয়েছিল, “প্রযোজক পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত…”। বাণিজ্যের ইঁদুর দৌড়ে একপ্রকার ব্রাত্যই হয়ে গিয়েছিলেন সহজ-সরল গল্প বলার এই জাদুকর। তাঁর আক্ষেপ ছিল, একটা সময় যেখানে বছরে ১৩০টি ছবি হত, আজ তা নেমে এসেছে ২৬-এ। ২০১৯ সালে তাঁর শেষ ছবি ‘ভালোবাসার গল্প’ মুক্তি পায়। এরপর একবুক সৃজনশীল তৃষ্ণা নিয়েই বিদায় নিলেন তিনি।

ক্যামেরার পিছনের ‘মানুষ’ রাজা সেন: তাপস চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণায়

পরিচালক হিসেবে রাজা সেন (Raja Sen) যতটা বড় মাপের ছিলেন, মানুষ হিসেবে ছিলেন ঠিক ততটাই মাটির কাছাকাছি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফিল্ম অ্যান্ড ফাইন আর্টস (NIFFA)-এ দীর্ঘ ৭-৮ বছর তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন প্রবীণ চলচ্চিত্র সম্পাদক তাপস চক্রবর্তী। দীর্ঘ ২৫-৩০ বছরের সম্পর্ক তাঁদের। তাপস চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে রাজা সেনের এক অজানা মানবিক রূপ।

তাপস চক্রবর্তী জানান, এত বড় মাপের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও রাজা সেনের (Raja Sen) মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। তিনি ছোট-বড় সকলকে সমান সম্মান দিতেন। তাপস বাবু স্মৃতিচারণ করে বলেন, রাজা সেনের (Raja Sen) ছবি নির্মাণের পদ্ধতি ছিল ভীষণ সহজ, সরল ও সাবলীল। বাংলা সাহিত্যের গল্প নিয়ে কাজ করতে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। অকারণ জটিলতা তৈরি করে ছবি বানানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। তাপস চক্রবর্তীর মতে, তৎকালীন সময়ে বাংলা সাহিত্যের সুন্দর গল্পগুলোকে এত সহজভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার মতো পরিচালকদের মধ্যে রাজা সেনই (Raja Sen) ছিলেন সেই প্রজন্মের শেষ পরিচালক।

খাদ্যরসিক ও এক আদর্শ শিক্ষক

নিফা-তে প্রিন্সিপাল থাকার পাশাপাশি সেখানে পরিচালনাও শেখাতেন রাজা সেন। তাপস চক্রবর্তী তাঁর স্মৃতি হাতড়ে জানান, রাজা সেন ছিলেন ভীষণ খাদ্যরসিক একজন মানুষ। কাজের ফাঁকে আলোচনায় বসলে তিনি প্রায়ই বলতেন, “বুঝলি তাপস, খাওয়াটা কিন্তু ভালো হতে হবে।” কাজের ফাঁকে কোথায় ভালো কাটলেট বা ফিশ কবিরাজি পাওয়া যায়, সেই খোঁজ তাঁর নখদর্পণে থাকত। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল শিঙাড়া, চপ, বেগুনি, কাটলেট বা ফিশ কবিরাজির মতো তেলে ভাজা খাবার।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য। তাপস চক্রবর্তী স্মরণ করেন, ছাত্রদের প্রতি রাজা সেনের (Raja Sen) অগাধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল। এমনকি নিজের পাওয়া কোনো প্রোজেক্ট, যেখানে তিনি শারীরিক কারণে যেতে পারতেন না, তা অনায়াসেই নিজের ছাত্রদের হাতে তুলে দিতেন। ছাত্রদের ভুলভ্রান্তি নিয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাপস বাবু জানান, ডিপ্লোমা ফিল্ম দেখার সময় কোনো ছাত্রের ভুল দেখে তিনি যখন কড়া ভাবে নম্বর কাটতে চাইতেন, তখন রাজা সেন (Raja Sen) হেসে বলতেন, “দ্যাখ বাবা, ভুল তো তুইও করেছিস। তুই ভুল করেছিস বলেই তো আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছিস। ওদের একটু ভুল করতে দে না! নম্বর কাটিস না, অনেক টাকা খরচ করে পড়তে আসে।” পরবর্তী প্রজন্মকে এমন উৎসাহ দেওয়ার মতো দুর্লভ গুণ আজ সত্যিই বিরল।

হারিয়ে গেল এক বটবৃক্ষ

তাপস চক্রবর্তীর কথায়, রাজা সেনের (Raja Sen) চলে যাওয়া মানে শুধু একজন পরিচালকের মৃত্যু নয়, বরং একটা আস্ত যুগের অবসান। তিনি মনে করেন, তিনবার জাতীয় পুরস্কার জয়ী এই মানুষের ‘অবদান’ নিয়ে নতুন করে কিছু বলা মানে তাঁকে ছোট করা। তাঁর কাজই তাঁর হয়ে কথা বলবে আজীবন।

আরও পড়ুন: স্কিনকেয়ারে ম্যাজিক না বিপদ? ব্যবহারের আগে জেনে নিন ‘২৪ ক্যারাট’ সোনার আসল সত্যি!

রাজা সেন (Raja Sen) চলে গেলেন, রেখে গেলেন বাংলা সিনেমা ও সিরিয়ালের এক বিশাল রত্নভাণ্ডার। ‘দামু’-র সেই নিষ্পাপ হাসি কিংবা ‘সুবর্ণলতা’-র সেই আত্মত্যাগ— বাঙালির হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই। সিনেমা জগতের এই অভিভাবকের প্রয়াণে টলিপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের গভীর ছায়া। এক যুগের অবসান হলো ঠিকই, কিন্তু সিনেমার ছাত্রদের কাছে তিনি চিরকাল এক উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক হয়েই থাকবেন।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img
Stay Connected
f
2,614
Facebook Followers
Follow
Must Read
Related News
spot_img