Pen Hospital: কলকাতার এসপ্ল্যানেড। ভিন্টেজ বার, পুরোনো ভগ্নপ্রায় ইমারত আর চৌরঙ্গীর বিখ্যাত মেট্রো সিনেমার ভিড়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত ‘হাসপাতাল’। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। মানুষের নয়, এখানে চিকিৎসা হয় কলমের! ব্যস্ত শহরের বুকে, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার যুগেও এই পেন হাসপাতাল (Pen Hospital) যেন এক থমকে থাকা নস্টালজিয়া, যেখানে আপনার সাধের ফাউন্টেন পেন (Fountain Pen) ফিরে পায় তার নতুন জীবন।

ধর্মতলার বুকে কলমের চিকিৎসালয়
১৯৪৬ সাল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ঠিক আগের বছর। মহম্মদ শামসুদ্দিনের হাত ধরে চৌরঙ্গী (Jawaharlal Nehru Road) রোডের ৯বি নম্বর ঠিকানায় পথ চলা শুরু করেছিল এই ঐতিহ্যবাহী দোকানটি (Pen Hospital) । আজ, প্রায় ৭৮ বছর পর, তাঁর নাতি মহম্মদ ইমতিয়াজ এবং ভাইপো শাহবাজ রিয়াজ পরম যত্নে সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। ইমতিয়াজ এখানে শুধু একজন বিক্রেতা নন, তিনি আক্ষরিক অর্থেই কলমের ‘চিকিৎসক’। রোগীর মতোই ভাঙা নিব, ব্লক হয়ে যাওয়া ইঙ্ক সকেট বা ক্ষতিগ্রস্ত বডি—সবকিছুর নিখুঁত ‘সার্জারি’ করেন তিনি। মাত্র ৫০ টাকার কনসালটেশন ফি-তে আপনার অসুস্থ কলমটি একেবারে সুস্থ হয়ে আপনার পকেটে ফিরে আসবে!

আরও পড়ুন: এক কাপ গ্রিন টির এত গুণ?
ছোট্ট একটি দোকান, যার ভেতরে পা রাখলেই মনে হবে যেন এক জীবন্ত মিউজিয়ামে ঢুকে পড়েছেন। কাঁচের ক্যাবিনেটের ভেতরে সারি সারি রাখা সাদা কাগজে মোড়া অসংখ্য কলম। প্রতিটি কাগজে লেখা রোগীর মালিকের নাম ও ঠিকানা। তারা সবাই সুস্থ হয়ে ‘ডিসচার্জ’ হওয়ার অপেক্ষায়! টেবিল ফ্যানের একঘেয়ে আওয়াজের মাঝেই ইমতিয়াজ পরম মমতায় সারিয়ে তোলেন একের পর এক কলম।

বাঙালির নস্টালজিয়া মানেই ফাউন্টেন পেন (Fountain Pen) আর তার শিরায় শিরায় দৌড়নো কালির আবেগ। একটা সময় ছিল যখন কালির দোয়াত মানেই ছিল স্বদেশের গর্ব ‘সুলেখা কালি’ (Sulekha Ink) । স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাতে তৈরি, মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদধন্য সুলেখা কালির সেই সুবাস আজও যেন মিশে আছে কলকাতার বাতাসে। আর সেই সুলেখা কালিতে (Sulekha Ink) চোবানো ফাউন্টেন পেনগুলো (Fountain Pen) যখন পুরোনো হয়ে যায় বা অবহেলায় নষ্ট হতে বসে? তখন তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে এসপ্ল্যানেড মেট্রোর ৪ নম্বর গেটের কাছের এই পেন হাসপাতাল (Pen Hospital)। সুলেখা কালি (Sulekha Ink) যেমন কলকাতার এক অবিচ্ছেদ্য হেরিটেজ, ঠিক তেমনই পেন হাসপাতালও (Pen Hospital) কলকাতার এক গর্বের হেরিটেজ এস্টাবলিশমেন্ট। এই দুইয়ের মেলবন্ধন যেন এক হারিয়ে যাওয়া যুগের চমৎকার রূপকথা।

ইমতিয়াজের মতে, ফাউন্টেন পেন (Sulekha Ink) নিছক কোনও স্টেশনারি জিনিস নয়, এটি একটি পারিবারিক ঐতিহ্য। বাবার বা দাদুর স্মৃতিমাখা ২০ হাজার টাকা দামের ভিন্টেজ ওয়াটারম্যান (Waterman) বা একশো বছরের পুরোনো পার্কার (Parker) কলমও পরম বিশ্বাসে মানুষ এখানে সারাই করতে দিয়ে যান। শুধু সারাই নয়, এই দোকানে রয়েছে এক বিশাল ভিন্টেজ কালেকশন। ফাইন, মিডিয়াম, ব্রড, ক্যালিগ্রাফি থেকে শুরু করে মেয়েদের ছোট হাতের জন্য বিশেষ বাঁকানো ‘লেডি নিব’—কী নেই এখানে! এককালে পাইলট বা উইলসনের মতো বড় কোম্পানিগুলো ভারত থেকে পাততাড়ি গোটালেও, এখানকার একনিষ্ঠ গ্রাহকদের ভালোবাসায় পেন হাসপাতাল আজও সগৌরবে টিকে আছে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক অনন্য মেলবন্ধন
ডিজিটাল এই যুগে যখন বলপেন আর কি-বোর্ডের দাপট, তখন ফাউন্টেন পেন (Fountain Pen) কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? ইমতিয়াজ হাসিমুখে জানান, রেট্রো ফ্যাশনের মতোই ফাউন্টেন পেন (Fountain Pen) এখন সগৌরবে ফিরে আসছে। নতুন প্রজন্ম আবারও কালি-কলমের প্রেমে পড়ছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঠাকুরদার কলম সারাতে আজও বহু মানুষ পেন হাসপাতালে (Pen Hospital) ছুটে আসেন। দ্রুতগতির জীবনে একটু বিরতি নিয়ে, সুলেখা কালিতে কলম ডুবিয়ে নিজের হাতে প্রিয়জনকে চিঠি লেখার মধ্যে যে আত্মিক শান্তি রয়েছে, তা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে কোথায়?
আরও পড়ুন: এক মঞ্চে তিন হেভিওয়েট নেতা! ‘দাদাগিরি’র সেটে দেবের মহা পরীক্ষা
আপনিও কি আপনার ড্রয়ারে পড়ে থাকা পুরোনো ফাউন্টেন পেনটাকে আবার সুলেখা কালিতে রাঙিয়ে তুলতে চান? তাহলে আজই অফিস থেকে ফেরার পথে একটু সময় করে ঘুরে আসুন কলকাতার এই ঐতিহ্যের ঠিকানা থেকে। তবে হ্যাঁ, ফেরার সময় কলমের ডাক্তারের সেই কড়া নির্দেশটি মাথায় রাখতে ভুলবেন না— “সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার জলে কলমের সকেটটা ধুয়ে নেবেন কিন্তু!”



