দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান! অবশেষে ৩০ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের (MCU) বহুচর্চিত ছবি— ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (Spider-Man: Brand New Day)। ‘নো ওয়ে হোম’(Spider-Man: No Way Home)-এর সেই হৃদয়বিদারক সমাপ্তির পর পিটার পার্কারের জীবনে ঠিক কী ঘটল, তা জানার জন্য মুখিয়ে ছিলেন গোটা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীরা।
আর সুখবর হলো, পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটনের হাত ধরে টম হল্যান্ড (Tom Holland) এমন এক স্পাইডার-ম্যানকে (SpiderMan) পর্দায় ফিরিয়ে এনেছেন, যা আগের সব সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, বাস্তবসম্মত এবং গভীর আবেগে ভরপুর। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ইতিমধ্যেই এই ছবিকে ‘মাস্ট-ওয়াচ’ তকমা দিচ্ছেন নেটিজেনরা। কিন্তু কেন এই সিনেমাটি আপনাকে প্রেক্ষাগৃহে টেনে নিয়ে যাবে? চলুন, নিশ্চিন্তে কোনো স্পয়লার ছাড়াই সেই রহস্যের জট খোলা যাক।
এক নতুন, একাকী পিটার পার্কার
স্পাইডার ম্যান (SpiderMan) সিরিজের আগের সিনেমাগুলোর মতো এখানে পিটার টনি স্টার্ক বা আয়রন ম্যান (Iron Man)-এর মত কোনো বিলিয়নেয়ার মেন্টর বা অ্যাভেঞ্জার্সদের (Avengers) বিশাল ব্যাকআপ পাচ্ছে না। ডক্টর স্ট্রেঞ্জ- এর জাদুর প্রভাবে এখন গোটা পৃথিবী ভুলে গেছে আমাদের পিটার পার্কার (Peter Parker)-কে। এই সিনেমায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পিটার পার্কারের (Peter Parker) চরিত্রিক বিবর্তন। আগের সিনেমাগুলোর সেই উচ্ছ্বল, হাসিখুশি স্কুলপড়ুয়া কিশোর আজ আর নেই। প্রায় ৩০-এর কোঠায় পা দেওয়া টম হল্যান্ডের পিটার এখন অনেক বেশি একা। তার আগের জীবনের কোনো অস্তিত্ব নেই—প্রিয় বন্ধু নেড (জ্যাকব ব্যাটালন) বা ভালোবাসার মানুষ এমজে (জেন্ডায়া) কেউই তাকে আর চেনে না।

আরও পড়ুন: ট্রেলারে বাজিমাত যশের! ভিএফএক্স-এর চমকের মাঝেও কেন বিভক্ত নেটপাড়া?
এমজেকে নতুন প্রেমিকের সাথে হাসতে দেখার যে নীরব যন্ত্রণা টম হল্যান্ড তার চোখের অভিব্যক্তিতে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। গ্যারেজের মতো এক চিলতে ঘরে একাকী বিজ্ঞান চর্চা আর নিউ ইয়র্কের রাস্তায় অপরাধ দমন—এটাই এখন তার জীবন। এই পিটার (Peter Parker) অনেক বেশি পরিণত। মজার ছলে বিশ্ব বাঁচানোর চেয়ে, নিজের ভেতরের একাকিত্বের সাথে তার লড়াইটা এই ছবিতে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এমনকি সিনেমার একটি দৃশ্যে কফি খাওয়ার সময়ও মাস্ক না খোলার দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেয়, নিজের সুপারহিরো সত্তার আড়ালে সে কতটা লুকিয়ে থাকতে চায়।
চেনা মুখের ভিড়ে নতুন চমক
আগের স্পাইডার-ম্যান (SpiderMan) ছবিগুলোর মতো এটি কেবল সুপারহিরোদের বিশাল মহাজাগতিক লড়াই নয়, বরং এটি একটি নিপাট ‘স্ট্রিট-লেভেল’ গল্প, যেখানে খোদ নিউ ইয়র্ক শহরটাই যেন একটা জীবন্ত চরিত্র। কাহিনিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্যাডি সিঙ্ক (Sadie Sink) অভিনীত এক ভয়ংকর মন-নিয়ন্ত্রণকারী (মাইন্ড-কন্ট্রোল) মিউট্যান্ট ‘জিন’ (Jean Grey) চরিত্রটি। মন নিয়ন্ত্রণ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন এই ভিলেন যখন এক শরীর থেকে অন্য শরীরে প্রবেশ করে, তখন স্পাইডি রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়ে।
পাশাপাশি ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর রহস্যময় কাজকর্ম কাহিনিতে একটি ডার্ক থ্রিলার ভাইব এনে দিয়েছে। ক্যামিও হিসেবে মার্ক রাফালো (হাল্ক) এবং ফ্লোরেন্স পিউ (ব্ল্যাক উইডো)-এর উপস্থিতি দর্শকদের জন্য বাড়তি পাওনা। ফ্লোরেন্স পিউ-এর স্টাইলিশ অবতার এবং হাল্কের সেই পরিচিত ‘স্ম্যাশ’ দৃশ্যগুলো হলের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই হাততালি কুড়োবে। আর ফ্র্যাঙ্কের (Frank Castle) চরিত্রে জন বার্নথালের (Jon Bernthal) সঙ্গে পিটারের অম্লমধুর সমীকরণ গল্পের গতিকে আরও জমজমাট করে তুলেছে।

অ্যাকশন ও আবেগের দুর্দান্ত ব্যালেন্স
অ্যাকশনের দিক থেকে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (Spider-Man: Brand New Day) এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটনের পরিচালনায় অ্যাকশন দৃশ্যগুলো হয়ে উঠেছে রীতিমতো রোমাঞ্চকর। বহুতল ভেঙে পড়া থেকে শুরু করে দুর্দান্ত নিনজা স্টাইলের ফাইট সিকোয়েন্স—সব মিলিয়ে চোখ ধাঁধানো অ্যাকশনের কোনো খামতি নেই এই সিনেমায়। স্পাইডার-ম্যানের (SpiderMan) ক্লান্ত শরীর, ক্ষয়ে যাওয়া স্পাইডার-স্যুট এবং তার শরীরের আঘাতের চিহ্নগুলো বুঝিয়ে দেয়, এই লড়াই কতটা বাস্তব। স্পাইডার-ম্যান (Spiderman) এখানে শুধু মারে না, বরং প্রচুর মারও খায়! আগের মতো গ্ল্যামারাস টেকনোলজির চেয়ে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং মাকড়সার আদিম সত্তার ওপর পিটারের (Peter Parker) নির্ভরশীলতা এই ছবিকে আরও সুন্দর রূপ দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ঋষিকেশে নতুন রোমাঞ্চ, গঙ্গার উপর কাঁচের সেতু
কেন দেখবেন সিনেমাটি?
“উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপন্সিবিলিটি”- বিখ্যাত এই সংলাপটির এক সম্পূর্ণ নতুন এবং গভীর অর্থ আপনি এই সিনেমায় খুঁজে পাবেন। ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (Spider-Man: Brand New Day) হয়তো স্পাইডার-ম্যান (SpiderMan) সিরিজের আগের ছবিগুলোর মতো শুধুই মারপিট এবং হাসি-মজায় ভরপুর নয়, কিন্তু এটি এমন এক সুপারহিরোর গল্প বলে, যে বারবার হোঁচট খেয়েও একা হাতে পৃথিবী বাঁচানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। দুর্দান্ত ওয়েব-সুইংগিং, টানটান অ্যাকশন এবং গভীর আবেগের এক নিখুঁত ককটেল এই সিনেমা। আপনি যদি স্পাইডার-ম্যানের (SpiderMan) অন্ধ ভক্ত হন, অথবা এমন কোনো সুপারহিরো মুভি খুঁজছেন যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে—তবে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (Spider-Man: Brand New Day) আপনার জন্যই। তাই দেরি না করে পপকর্ন হাতে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে চলে যান, কারণ এই নতুন স্পাইডার-ম্যানের (SpiderMan) যাত্রা কোনোভাবেই মিস করার মতো নয়!



