অজান্তেই কি নিজের সাথে কথা (Self-talk) বলছেন ? অথবা ফাঁকা ঘরে একান্তে বসে আছেন, আর আপনমনেই বকবক করছেন? কখনো হয়তো হাসছেন, কখনো আবার ভ্রু কুঁচকে নিজেকেই শাসন করছেন বা পুরোনো কোনো রাগ নিজের মনেই উগরে দিচ্ছেন। আশপাশে কেউ হঠাৎ দেখলে হয়তো ভেবে বসতে পারে, আপনি বোধহয় পাগল হয়ে গেছেন! কিন্তু সত্যিটা হলো, এই অভ্যাস আমাদের প্রায় সকলেরই আছে। নিজের ভাবনা, স্বপ্ন, দ্বিধা বা অভিমান নিজের সঙ্গেই ভাগ করে নেওয়ার এই চমৎকার প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Self-talk বা নিজের সাথে কথা বলা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই একা একা কথা বলা কি সত্যিই স্বাভাবিক? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মানসিক কোনো জটিলতা? বিশিষ্ট মনোবিদদের মতে, এটি মোটেও কোনো অস্বাভাবিক আচরণ নয়, বরং এটি মানুষের বেঁচে থাকার বা মানসিক চাপ সামলানোর একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক কৌশল।
Self-talk আসলে কী?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটিকে এককথায় ‘লাউড থিঙ্কিং’ বা সশব্দে চিন্তাভাবনা করা বলা যেতে পারে। মানুষ নিজেকে নিরাপদ রাখতে এবং জীবনের জটিল পরিস্থিতিগুলো সামাল দিতে খুব অল্প বয়স থেকেই এই কৌশল অবচেতনভাবে রপ্ত করে ফেলে। জীবনে কোন পথটি সঠিক, কার সাথে কেমন আচরণ করা উচিত, বা কোন কাজটিতে বিপদ হতে পারে— মনের ভেতরের এই নিরন্তর দ্বন্দ্বগুলোই অনেক সময় কথার রূপ নিয়ে আমাদের অজান্তেই ঠোঁটের বাইরে চলে আসে। বিশেষ করে যাঁদের মধ্যে একটু বেশি উদ্বেগ (Anxiety) বা মানসিক চাপ কাজ করে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
আরও পড়ুন: শরীর ভালো, তবু মুড অফ কেন?

ইতিবাচক Self-talk এর জাদুকরী শক্তি
মনোবিজ্ঞানীরা এই অভ্যাসকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হাতিয়ার হিসেবেই দেখেন। আপনি যদি নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথোপকথন করেন, তবে তা আপনার জীবনে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে।
- আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: “আমি ঠিক পারব”, “সব ঠিক হয়ে যাবে”, বা “কাজটা আমাকে এভাবেই করতে হবে”— এমন কথাগুলো নিজেকে শোনালে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়।
- কাজের প্রস্তুতি: কঠিন কোনো কাজ করার আগে নিজের মনে সেটা ঝালিয়ে নিলে সফলতার হার বৃদ্ধি পায়।
- সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ: নিজের মনের দ্বন্দ্বগুলো আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে যায়, যা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
কখন এটি বিপজ্জনক?
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। নিজের সঙ্গে কথা বলা তখনই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়, যখন তা নেতিবাচকতার রূপ নেয়। অনেকেই আছেন যাঁরা নিজের মনে শুধু নিজের খুঁত ধরেন। “আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না”, “আমি দেখতে একটুও ভালো নই”, “সবাই আমার চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে”— এই ধরনের আত্ম-সমালোচনা বা ‘নেগেটিভ সেল্ফ টক’ মনের জোর একেবারে তলানিতে এনে ঠেকায়। বিশেষ করে যাঁদের মধ্যে উদ্বেগ (Anxiety), অবসাদ বা পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি বেশি, তাঁদের মধ্যে এই ক্ষতিকর প্রবণতা প্রবল। নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার এই মানসিকতা মানুষকে ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

তাহলে উপায়? মনোবিজ্ঞানীদের সুস্পষ্ট পরামর্শ হলো, মনের স্টিয়ারিং নিজের হাতেই রাখতে হবে। নেতিবাচক বা আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার মতো ভাবনা এলেই তাকে সচেতনভাবে ‘স্টপ’ বলতে হবে। নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক না হয়ে, নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে উঠুন। যদি মনে হয় নেতিবাচক চিন্তার জাল আপনি নিজে ছিঁড়ে বেরোতে পারছেন না, তবে প্রিয়জন বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। মনের দরজা খুলে কথা বলুন তাদের সঙ্গে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি?
নিজের মনে কথা বলা ভালো, কিন্তু তা যদি মাত্রা ছাড়ায়, তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ছোট একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও যদি নিজের মনের সঙ্গে আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই করতে হয়, তবে তা স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ঘটায়। সবচেয়ে বিপদের কথা হলো, যখন মানুষ বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা গুলিয়ে ফেলেন। নিজের মনের আওয়াজকে যদি কাল্পনিক অন্য কারও কণ্ঠস্বর বলে মনে হয়, বা রোগী যদি মনে করেন অদৃশ্য কেউ তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছে বা সাবধান করছে এবং তিনি তার উত্তরও দিচ্ছেন— তবে তা হ্যালুসিনেশন বা গুরুতর মানসিক ব্যাধির লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দেরি না করে অবশ্যই কোনো অভিজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন: আনফিল্টার্ড রূপে কাঁপন ধরালেন যশ, কেমন হল গীতু মোহানদাসের ডার্ক ফেয়ারিটেল?
পরিশেষে বলা যায়, নিজের সঙ্গে কথা বলা কোনো অপরাধ বা পাগলামি নয়, বরং নিজেকে গভীরভাবে চেনার এক সেরা মাধ্যম। তাই নিজের সঙ্গে রোজ কথা বলুন। তবে খেয়াল রাখবেন, সেই কথোপকথন যেন আপনাকে পিছনের দিকে টেনে না ধরে, বরং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। মনের যত্ন নিন, ইতিবাচক থাকুন!



