বাঙালির নস্টালজিয়া, বাঙালির প্রথম প্রেম এবং চিরকালীন আবেগ—এই সবকিছুরই অপর নাম উত্তম কুমার (Uttam Kumar) । সাদাকালো ফ্রেম থেকে রঙিন পর্দা, তাঁর ভুবনভোলানো হাসি, ট্রেডমার্ক হাঁটাচলা আর নিখুঁত অভিনয় জাদুতে আজও বুঁদ হয়ে আছে গোটা বাংলা। উত্তম কুমার (Uttam Kumar) মানেই বাঙালির এক অবিচ্ছেদ্য অহংকার। আর সেই চিরন্তন আবেগে এবার নতুন করে শান দিতে চলেছে রাজ্য সরকার। মহানায়ক উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বছরভর এক বিপুল ও মহোৎসবের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাংলার চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক নতুন স্বর্ণালি অধ্যায় হতে চলেছে।
নন্দনে চাঁদের হাট: মেগা প্রস্তুতির ঝলক
বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র নন্দন চত্বর যেন আক্ষরিক অর্থেই এক টুকরো টলিউড হয়ে উঠেছিল! রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন নন্দনে জড়ো হয়েছিলেন বাংলা বিনোদন জগতের একাধিক প্রজন্মের তাবড় তারকারা। উপস্থিত ছিলেন মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী, ইন্ডাস্ট্রির বুম্বাদা অর্থাৎ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মমতা শংকর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
এছাড়াও ছিলেন রুদ্রনীল ঘোষ, প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ, জিৎ, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, যীশু সেনগুপ্ত, সৃজিত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আজকের প্রজন্মের বনি সেনগুপ্ত, কৌশানি মুখোপাধ্যায়, পায়েল সরকারের মতো আরও অনেক চেনা মুখ। তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মূলত আলোচনা হয়, কীভাবে আরও নিখুঁত এবং গ্র্যান্ড স্কেলে সাজানো যায় বাঙালির ম্যাটিনি আইডলের এই শতবর্ষের মেগা অনুষ্ঠান।
মুখ্যমন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে জানান, “আমার মুখ্যমন্ত্রীত্বের এবং একইসঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রীত্বের এই সময়কালে মহানায়কের জন্মশতবর্ষ পালন করার সুযোগ পাওয়াটা আমার কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। উত্তমকুমার তো শুধু রূপোলি পর্দার একজন নায়ক নন, তিনি নায়কদের নায়ক—বাঙালির একমাত্র মহানায়ক!”
আরও পড়ুন: রক্তক্ষয়ী ১৯৪৭! দেশভাগের যন্ত্রণার মাঝেও থামেনি টলিউড! অজানা ইতিহাসে অবাক হবেন
কী কী চমক থাকছে উত্তম-স্মরণে?
আগামী ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে চলবে মূল অনুষ্ঠান। তবে চমক শুধু কয়েকদিনের আয়োজনেই আটকে নেই! এক নজরে দেখে নেওয়া যাক মহানায়ককে চিরস্মরণীয় করে রাখতে রাজ্য সরকারের নেওয়া কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ:

- মাঝরাতে সেলিব্রেশন ও নস্টালজিক হেরিটেজ ওয়াক:
মহানায়কের জন্মদিনে ঠিক রাত ১২টায় কাটা হবে বিশেষ বার্থডে কেক। পাশাপাশি, উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) স্মৃতিবিজড়িত কলকাতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক জায়গাগুলো নিয়ে আয়োজিত হবে একটি আকর্ষণীয় ‘হেরিটেজ ওয়াক’, যা সাধারণ মানুষকে তাঁর জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। - নিউটাউনে অত্যাধুনিক কালচারাল হাব ও ফিল্ম সেন্টার:
রাজ্যের উদ্যোগে নিউটাউনে গড়ে তোলা হবে একটি ওয়ার্ল্ড-ক্লাস ‘উত্তম কুমার জন্মশতবার্ষিকী ফিল্ম সেন্টার’। এটি শুধুমাত্র একটি প্রদর্শন কেন্দ্র হবে না, বরং একটি সম্পূর্ণ মিউজিয়াম ও কালচারাল হাব হিসেবে মহানায়কের (Uttam Kumar) সুদীর্ঘ কর্মজীবনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে। - নতুন রূপ পাবে ‘উত্তম মঞ্চ’:
দক্ষিণ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘উত্তম মঞ্চ’-এর বর্তমান বেহাল দশা কাটিয়ে এটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক, সুন্দর এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করে রিনোভেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা পৌর নিগম ও রাজ্য সরকার।

- দুষ্প্রাপ্য ছবির পুনরুদ্ধার ও রেট্রোস্পেক্টিভ ফেস্টিভ্যাল:
মহানায়কের (Uttam Kumar) কালজয়ী সিনেমাগুলি নিয়ে একটি এক্সক্লুসিভ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত দুষ্প্রাপ্য ক্লাসিক ছবিগুলি কালের নিয়মে হারিয়ে যেতে বসেছে বা প্রিন্ট নষ্ট হতে চলেছে, সেগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার (Restoration) করে আর্কাইভ করার এক বিরাট প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে চলচ্চিত্র পড়ুয়াদের জন্য এক বড় পাওনা। - স্মারক ডাক কভার ও গ্রন্থ প্রকাশ:
কিংবদন্তি এই শিল্পীকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে সম্মান জানাতে ভারতীয় ডাক বিভাগের তরফ থেকে প্রকাশ করা হবে বিশেষ ‘ডাক কভার’। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হবে একটি সুদৃশ্য স্মারক গ্রন্থ। - বিশেষ প্রদর্শনী ও বৌদ্ধিক আলোচনা চক্র:
নন্দন চত্বরে তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের উদ্যোগে উত্তম কুমারের দুর্লভ ও অদেখা ছবি, অরিজিনাল সিনেমার পোস্টার ও তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী হবে। পাশাপাশি গবেষক, চিত্রসমালোচক ও শিল্পীদের নিয়ে চলবে দিনভর আড্ডা ও সেমিনার। ৩ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের দেওয়া হবে বিশেষ সংবর্ধনা।
ডিসেম্বরেই ৩২তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
উত্তম-বন্দনার পাশাপাশি এদিন সিনে-প্রেমীদের জন্য আরও একটি বড় সারপ্রাইজ ঘোষণা করা হয়। জানিয়ে দেওয়া হয় আসন্ন ৩২তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ। ২০২৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতায় অনুষ্ঠিত হবে দেশ-বিদেশের সিনেমাপ্রেমীদের এই মিলনমেলা।
জাতীয় স্তর এবং অন্যান্য রাজ্যের চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই মেগা ইভেন্টের সূচি স্থির করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তবে উৎসবের চেয়ারপার্সন হিসেবে এবার কে দায়িত্বভার সামলাবেন, তা নিয়ে এখনও জল্পনা জিইয়ে রাখা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগপ্রবণ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “উত্তম কুমারকে এই আন্তর্জাতিক স্তরে সেলিব্রেট করার ভাবনাটা সত্যিই অভাবনীয় এবং অত্যন্ত সাধু একটি উদ্যোগ। যে কালচারাল হাব তৈরির কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে দিয়ে বাংলা সিনেমার বর্ণময় ১০০ বছরের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে জীবন্ত হয়ে উঠবে।”
আরও পড়ুন: টাকার গদিতে কালীন ভাইয়া! ‘মির্জাপুর দ্য মুভি’-তে কার ক্যাশবাক্সে ঢুকল কত কোটি?
বাঙালির কাছে উত্তম কুমার মানে শুধু একজন প্রাক্তন সুপারস্টার নন; তিনি বাঙালির আটপৌরে জীবনের ফাঁকে চিরকালীন রোম্যান্স, একটা গোটা যুগের সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি। তাঁর এই জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের ব্লু-প্রিন্ট আরও একবার প্রমাণ করে দিল, উত্তম কুমার অতীত নন, তিনি বাঙালির বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা!



