ভাদ্রের আকাশে কালো করে নামছে বৃষ্টি, আর বাতাসে ভাসছে পাকা তালের মিষ্টি সুবাস। এই গন্ধটাই যেন মনে করিয়ে দেয়, নন্দোৎসব দোরগোড়ায়! সামনেই (Janmashtami) জন্মাষ্টমী, আর এই পুণ্য তিথিতে বাড়ির ছোট্ট গোপালকে খুশি করতে সেরা তালের রেসিপি খুঁজছেন? তবে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন।

আরও পড়ুন: সব সময় ‘ভালো থাকার’ চাপ আপনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে! আসল পজিটিভিটি আসলে কী?
জন্মাষ্টমী (Janmashtami) মানেই ভক্তি, প্রেম এবং অবশ্যই সুস্বাদু ভোগের ছড়াছড়ি। শাস্ত্র মতে, জন্মাষ্টমীতে (Janmashtami) তালের ভোগ নিবেদন করলে ঘরে সুখ-সমৃদ্ধি আসে এবং পরমেশ্বরের আশীর্বাদ লাভ হয়। নিয়ম মেনে শ্রীকৃষ্ণকে ছাপান্ন ভোগ নিবেদন করার চল থাকলেও, সব সময় তা হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু ভক্তিভরে নিজের হাতে বানানো একটি সামান্য মিষ্টিও যদি আমরা গোপালকে নিবেদন করি, তিনি তাতেই সন্তুষ্ট হন। আর জন্মাষ্টমী (Janmashtami) এবং তাল—এই দুইয়ের সম্পর্ক তো অবিচ্ছেদ্য! গোকুলে নন্দ উৎসবে কৃষ্ণের আবির্ভাব উপলক্ষে এই তালের বড়া খেয়েই প্রথম উৎসব পালিত হয়েছিল বলে শোনা যায়।

আজকাল অনেকেই সময়ের অভাবে দোকান থেকে তালের বড়া কিনে আনেন। কিন্তু নিজের হাতে পরম স্নেহে গোপালকে ভোগ বানিয়ে দেওয়ার যে আত্মিক শান্তি, তা কি কেনা মিষ্টিতে মেলে? তাই এই জন্মাষ্টমীতে (Janmashtami) আপনার রান্নাঘর হয়ে উঠুক বৃন্দাবন। খুব সামান্য উপকরণ আর একটুখানি ভালোবাসা দিয়ে বানিয়ে ফেলুন তালের তিন রকম অপূর্ব পদ—তালের মালপোয়া, তালের ক্ষীর এবং চিরপরিচিত তালের বড়া। রইল বিস্তারিত ও সহজ প্রণালী।

১. রসে-বশে নরম তুলতুলে ‘তালের মালপোয়া’
উপকরণ:
- সুজি – ১ কাপ
- ময়দা – ২ কাপ
- চিনি – দেড় কাপ (মিষ্টি অনুযায়ী কম-বেশি করতে পারেন)
- নারকেল কোরা – ১ কাপ
- খাঁটি তালের ক্বাথ – ১ কাপ
- মৌরি – ১ চা চামচ
- ঠান্ডা দুধ – ৩ কাপ
- নুন – এক চিমটে
- ভাজার জন্য সাদা তেল
কীভাবে বানাবেন:
প্রথমে একটি পরিষ্কার বড় পাত্র নিন। তাতে ময়দা, সুজি, চিনি, তালের ক্বাথ, নারকেল কোরা এবং এক চিমটে নুন খুব ভালো করে মিশিয়ে নিন। এবার হাতের তালুতে মৌরি নিয়ে আলতো করে ঘষে মিশ্রণে ছড়িয়ে দিন, এতে চমৎকার একটা গন্ধ বেরোবে। এরপর অল্প অল্প করে ঠান্ডা দুধ ঢেলে একটি মসৃণ গোলা বা ব্যাটার তৈরি করুন। মিশ্রণটি আধ ঘণ্টার জন্য ঢাকা দিয়ে বিশ্রাম দিন।
আধ ঘণ্টা পর যদি দেখেন সুজি দুধ টেনে ব্যাটার ঘন করে ফেলেছে, তবে আরও একটু দুধ মেশাতে পারেন। এবার কড়াইতে বেশ কিছুটা তেল গরম করে, হাতায় করে অল্প অল্প গোলা নিয়ে ডুবো তেলে ছেড়ে দিন। লালচে করে ভেজে তুলে টিস্যু পেপারের ওপর রাখুন। পরিবেশনের সময় গরম মালপোয়ার ওপর ঠান্ডা ক্ষীর ছড়িয়ে দিলে গোপাল তো বটেই, বাড়ির সকলেও আঙুল চাটবে!

২. অমৃতের মতো স্বাদ ‘তালের ক্ষীর’
জন্মাষ্টমীর আগে মিষ্টির দোকানে বড়া পাওয়া গেলেও, তালের ক্ষীর কিন্তু সচরাচর মেলে না। তাই এই অনন্য পদটি বাড়িতে বানিয়েই তাক লাগিয়ে দিন।
উপকরণ:
- পাকা তাল – ১টি
- দুধ – দে়ড় লিটার
- চিনি – ৭৫ গ্রাম (বা স্বাদমতো)
- নারকেল কোরা – ৪-৫ টেবিল চামচ
- গাওয়া ঘি – ১ টেবিল চামচ
- পেস্তা কুচি – ১ টেবিল চামচ
- নুন – সামান্য
কীভাবে বানাবেন:
তালের বড় সমস্যা হলো অনেক সময় এতে একটা তিতকুটে ভাব থাকে। এই তেতোভাব কাটাতে তালের খোসা ছাড়িয়ে মণ্ডগুলি চুনজলে দু’ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এরপর জল ঝরিয়ে ঘন ক্বাথ বের করে নিন। অন্য একটি পাত্রে দেড় লিটার দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে এক লিটার করে নিন।
এবার আসল ম্যাজিক! কড়াইতে এক চামচ ঘি গরম করে তালের ক্বাথ দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। ঘিয়ের সুবাসে তালের গন্ধ আরও খোলতাই হবে। এরপর চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। চিনি গলে গেলে নারকেল কোরা মেশান। এবার আগে থেকে ঘন করে রাখা দুধ ঢেলে দিয়ে মাঝারি আঁচে দশ মিনিট ফোটান। সামান্য এক চিমটে নুন মিষ্টির স্বাদকে ব্যালেন্স করবে। মিশ্রণটি ঘন ও থকথকে হয়ে এলে গ্যাস বন্ধ করে দিন। ওপর থেকে পেস্তা কুচি ছড়িয়ে ঠান্ডা করে গোপালকে নিবেদন করুন।

নন্দোৎসবের বিশেষ আনন্দ: তালের বড়া
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, গোকুলে কৃষ্ণের জন্মলগ্নে নন্দোৎসবে প্রথম পরিবেশন করা হয়েছিল এই তালের বড়া। তাই এই পদ ছাড়া জন্মাষ্টমীর (Janmashtami) পার্বণ ভাবাই যায় না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ট্র্যাডিশনাল পদটি বানানো সবচেয়ে সহজ, যদি আপনি সঠিক অনুপাত মেনে চলেন।
উপকরণ:
- আটা – ১ বাটি
- ময়দা – ১ বাটি
- সুজি – ১ বাটি
- ঘন তালের শাঁস – দেড় বাটি (একটু বেশি দিলে স্বাদ বাড়ে)
- নারকেল কোরা – ১ বাটি
- চিনি – পরিমাণমতো
- নুন – সামান্য
- সাদা তেল – ভাজার জন্য
কীভাবে বানাবেন:
এই রেসিপির আসল চাবিকাঠি হলো এর মাপ। আটা, ময়দা ও সুজি সমপরিমাণে নিতে হবে। একটি পাত্রে এই তিনটির সাথে নুন, চিনি, নারকেল কোরা এবং তালের ঘন ক্বাথ দিয়ে খুব ভালো করে মেখে নিন। যত ভালো করে ফেটাবেন, বড়া তত ফুলবে এবং নরম হবে। মাখা হয়ে গেলে ১৫ মিনিট ঢাকা দিয়ে রাখুন যাতে সুজি ফুলে ওঠে।
এবার কড়াইতে তেল গরম করুন। মাঝারি আঁচে মিশ্রণ থেকে ছোট ছোট বলের মতো করে তেলে ছাড়তে থাকুন। সময় নিয়ে গোল্ডেন ব্রাউন বা সোনালি বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। মুচমুচে তালের বড়া একেবারে প্রস্তুত!

আরও পড়ুন: দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রতীক্ষা! কেমন হলো পর্দায় শিবম পণ্ডিতের প্রত্যাবর্তন
ভক্তিভরে নিবেদন করা সামান্য তুলসী পাতা আর জলেও ভগবান সন্তুষ্ট হন। তবে এই জন্মাষ্টমীতে (Janmashtami) আপনার নিজের হাতে পরম স্নেহে তৈরি এই ঘরোয়া ভোগ যখন ছোট্ট গোপালের চরণে নিবেদন করবেন, তখন আপনার পুরো ঘর ভরে উঠবে এক স্বর্গীয় সুবাসে। এবার তবে আর দেরি না করে, এই জন্মাষ্টমীতেই (Janmashtami) বানিয়ে ফেলুন এই তিনটি অপূর্ব রেসিপি আর আপনার ছোট্ট গোপালকে প্রসন্ন করে তুলুন।


