Kabhi Alvida Naa Kehna: ২০০৬ সালের ১১ অগস্ট। ভারতীয় রূপোলি পর্দায় মুক্তি পেল এমন এক ছবি, যা তৎকালীন দর্শককে রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ, ছবিটির পরিচালক ছিলেন করণ জোহর (Karan Johar)—যিনি এর আগে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’ (Kabhi Khushi Kabhie Gham) বা ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (Kuch Kuch Hota Hai)-এর মতো ছবির মাধ্যমে “পরিবারই সব” এবং “প্রেম মানেই বন্ধুত্ব” এই ধারণাকে মহিমান্বিত করেছিলেন। কিন্তু ‘কভি আলবিদা না কেহনা’ (Kabhi Alvida Naa Kehna) ছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরের গান। আজ, মুক্তির ২০ বছর পর দাঁড়িয়ে ছবিটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়—ছবিটি কি কেবল পরকীয়াকে প্রশ্রয় দিয়েছিল, নাকি এক মৃতপ্রায় দাম্পত্যের গল্পকে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিল?

মুক্তির পর থেকেই ছবিটি দর্শককে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল। একদলের মতে, করণ জোহর দাম্পত্যের পবিত্রতাকে কালিমালিপ্ত করে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে গ্ল্যামারাইজ করেছেন। অন্য দলের মতে, এটি ছিল আধুনিক দাম্পত্যের এক অত্যন্ত পরিণত ও সৎ ব্যবচ্ছেদ। দেব (শাহরুখ খান) আর মায়ার (রানি মুখোপাধ্যায়) প্রেম নিয়ে অনেকেরই আপত্তি ছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি অখুশি হওয়া মানেই কি তৃতীয় কাউকে খুঁজে নেওয়া? একটি খারাপ দাম্পত্য কি বিশ্বাসঘাতকতার অজুহাত হতে পারে?
চেনা ছক ভাঙার গল্প
ছবিটিতে শাহরুখের চেনা ‘রোমান্টিক হিরো’ ইমেজ একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক। দুই হাত ছড়িয়ে ভালোবাসা বিলিয়ে দেওয়া শাহরুখ এখানে কোনো আদর্শ প্রেমিক নন; তিনি তিক্ত, আত্মকেন্দ্রিক এবং ব্যর্থ একজন ফুটবলার। স্ত্রী রিয়ার (প্রীতি জিন্টা) পেশাদার সাফল্য তার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে আঘাত করে। অন্যদিকে, মায়া এমন এক নারী, যে তার বেস্ট ফ্রেন্ড ঋষিকে (অভিষেক বচ্চন) বিয়ে করার মতো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ঋষির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শারীরিক নৈকট্যের চাহিদা তার কাছে দমবন্ধ করা মনে হতো।

আরও পড়ুন: মৃত্যুকে হারিয়ে অবিশ্বাস্য জয়!
আসল সত্যিটা হলো, দেব আর মায়ার পরকীয়া এখানে কোনো সুখী দাম্পত্যকে ভাঙেনি। বরং যে সম্পর্কগুলো অনেক আগেই নিঃশব্দে মরে গিয়েছিল, এই পরকীয়া ছিল তারই একটি উপসর্গ মাত্র। দেব এবং মায়ার প্রেম কোনো রাতারাতি ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না। এটি ছিল শূন্যতার পারদ চড়তে চড়তে হঠাৎ পাওয়া এক মুক্তির অনুভূতি। তারা দুজনেই নিজেদের দাম্পত্যে ব্যর্থ এবং সেই ব্যর্থতার মিল থেকেই তাদের কাছে আসা।
‘প্যার দোস্তি হ্যায়’ তত্ত্বের পতন
‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (Kuch Kuch Hota Hai)-তে করণ নিজেই শিখিয়েছিলেন “প্যার দোস্তি হ্যায়” (প্রেম মানেই বন্ধুত্ব)। কিন্তু ‘কাভি আলবিদা না কেহনা’ (Kabhi Alvida Naa Kehna)-তে এসে তিনি নিজেই নিজের তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করলেন। তিনি দেখালেন, বন্ধুত্বের কাঁধে প্রেমের ভার চাপিয়ে দিলে তা কতটা ভয়ংকর হতে পারে! মায়া আর ঋষির সম্পর্ক তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। বন্ধুত্ব কখনো প্রেমের অভাব পূরণ করতে পারে না; বরং তা দাম্পত্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে, যেখানে সম্মান থাকলেও আবেগ থাকে না।

বিশ্বাসঘাতকতার চরম মূল্য
অনেকেই মনে করেন ছবিটি পরকীয়াকে প্রশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু আদতে তা নয়। দেব এবং মায়াকে তাদের কৃতকর্মের চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। রিয়া এবং ঋষি—যারা সততার সাথে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, তারা বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করেনি। স্যাম (অমিতাভ বচ্চন) যখন মায়াকে বলে ঋষিকে ছেড়ে দিতে, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল ঋষিকে এমন কারোর কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, যে সত্যিই তাকে ভালোবাসবে। শেষে দেব আর মায়ার মিলন হলেও, তার মধ্যে কোনো জাঁকজমক বা বিজয়ের উল্লাস ছিল না; ছিল কেবলই এক বুক ক্লান্তি আর একাকিত্বের ছাপ।

মুক্তির সময় ছবিটি নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন, ছবিটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ইন্ধন জোগাচ্ছে। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ছবিটি দেখলে বোঝা যায়, এটি মোটেও পরকীয়ার উদযাপন ছিল না। এটি ছিল একটা সাহসী স্বীকারোক্তি যে, ভুল কারণে বা কেবলমাত্র সামাজিক চাপে বিয়ে করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
আরও পড়ুন: আনফিল্টার্ড রূপে কাঁপন ধরালেন যশ, কেমন হল গীতু মোহানদাসের ডার্ক ফেয়ারিটেল?
‘কভি আলবিদা না কেহনা’ (Kabhi Alvida Naa Kehna) আমাদের শেখায় যে, জোর করে একটা মরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো নিজের প্রতি এবং পার্টনারের প্রতি সৎ থাকা। করণ জোহরের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা ও অস্বস্তিকর এই প্রেমের গল্পটি তাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান বাস্তব।



