পাতাল ভুবনেশ্বর (Patal Bhuvaneshwar), পাহাড়ের নীচে একটা গুহা, অন্ধকার সরু পথ পেরিয়ে যত ভিতরে যাচ্ছেন, ততই বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্য। কোথাও শিবলিঙ্গের মতো পাথর, কোথাও শেষনাগের অবয়ব, কোথাও আবার গণেশের আকৃতি। এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজা ঋতুপর্ণ, মহাভারতের পাণ্ডব এবং শিবের উপাসনার নানা কাহিনি। তাই পাতাল ভুবনেশ্বরকে ঘিরে প্রশ্নটা আজও একই—এটা কি শুধুই এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক গুহা, নাকি এর ভিতরে লুকিয়ে আছে কোনও পুরনো পৌরাণিক বিশ্বাসের গল্প?

পাতাল ভুবনেশ্বর (Patal Bhuvaneshwar) উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার গঙ্গোলিহাটের কাছে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক চুনাপাথরের গুহা-মন্দির। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি মূলত ভগবান শিবের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত। সরু সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে নীচে নামলে একের পর এক গুহার দেখা মেলে।
আরও পড়ুন – মাঝরাতে শুভশ্রীকে ফোন, কীভাবে শুরু ‘দেশু ৭’-এর সফর?
এই গুহার (Patal Bhuvaneshwar)পৌরাণিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হল স্কন্দ পুরাণের মানস খণ্ড। সরকারি কুমায়ুন মণ্ডল ওয়েবসাইটেও পাতাল ভুবনেশ্বরের সঙ্গে এই গ্রন্থের যোগের কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে সূর্যবংশীয় রাজা ঋতুপর্ণ এই গুহা আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁকে গুহার ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন শেষনাগের নাগরাজ—এমনটাই লোকবিশ্বাস। সেখানে তিনি শিব-সহ ৩৩ কোটি দেবদেবীর দর্শন পেয়েছিলেন বলে কাহিনি প্রচলিত।

গুহার (Patal Bhuvaneshwar)ভিতরের চুনাপাথরের যে প্রাকৃতিক গঠন গুলিই আসলে পুরো রহস্যটাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারি পর্যটন তথ্যেও শিবলিঙ্গ, শেষনাগ, গণেশ, গরুড়-সহ বিভিন্ন দেবদেবীর মতো দেখতে প্রাকৃতিক পাথরগঠনের উল্লেখ রয়েছে। শিবের জটার মতো দেখতে বিশাল স্ট্যালাকটাইটও এখানে দেখা যায় বলে উত্তরাখণ্ড সরকারের পর্যটন তথ্য জানাচ্ছে। অর্থাৎ প্রকৃতির তৈরি গঠন আর মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস—দুটো এখানে একেবারে পাশাপাশি চলে।

আর পাতাল ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে চমকপ্রদ কিংবদন্তিগুলির একটি জড়িয়ে রয়েছে গণেশকে ঘিরে। প্রচলিত বিশ্বাস, শিবের ক্রোধে গণেশের মস্তক ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেই পুরনো মস্তকটি পাতাল ভুবনেশ্বরের গুহায় রাখা হয়েছিল। পরে পার্বতীর অনুরোধে শিব গণেশের শরীরে হাতির মস্তক স্থাপন করেন।বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান শিব পাতাল ভুবনেশ্বর গুহায় গণেশের আসল মানব মস্তকটি রেখেছিলেন। মস্তকটি এখন চুনাপাথরের একটি স্তরে আবৃত, যার উপরে আটটি পাপড়িযুক্ত পদ্মের মতো একটি গঠন (ব্রহ্মকমল বা “স্বর্গীয় পদ্ম”) রয়েছে, যেখান থেকে অমৃতের ফোঁটা ভগবান গণেশের মস্তকে পতিত হয় বলে কথিত আছে। বিশ্বাস করা হয় যে স্বয়ং ভগবান শিবই এখানে ব্রহ্মকমল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পাণ্ডবদের নিয়েও এখানে একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। বলা হয়, মহাভারতের যুদ্ধের পর শেষযাত্রার আগে তাঁরা এখানে শিবের আরাধনা করেছিলেন। এটিও মূলত বিশ্বাস ও কিংবদন্তির অংশ, প্রমাণিত ইতিহাস নয়।
যাবেন কি করে ?

গাড়ি নিয়ে গুহার কাছাকাছি পৌঁছনোর পর কিছুটা পথ হেঁটে প্রবেশপথে যেতে হয়। এরপর শুরু হয় আসল পথ। প্রায় ৮২টি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে হয়, তারপর সরু ও অন্ধকার গুহার (Patal Bhuvaneshwar) ভিতর দিয়ে এগোতে হয়।ভিতরে আলোও কম। নিরাপত্তার জন্য লোহার চেন ধরে এগোনোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সিঁড়ি গুলি যেহেতু পাহাড় কেটে তৈরি তাই সেগুলি অনেকটা এবড়ো-খেবড়ো। আর অনবরত সেখানে জল পড়ছে। কেউ জানে না সেই জল কোথা থেকে কোন পাহাড়ের গা বেয়ে আসছে। সেখানে বসে বসে নামতে হয়।
তাই এখানে নামার সময় তাড়াহুড়ো না করাই সবচেয়ে ভালো। বিশেষ করে পাথুরে বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় পা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। চটি বা মসৃণ সোলের জুতো না পরে ভালো গ্রিপের জুতো পরাই ভালো। সঙ্গে পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখতে পারেন। পিথোরাগড় জেলা প্রশাসনের বর্তমান তথ্যেও গুহায় যাওয়ার পথকে একটি সরু, অন্ধকার জলপথ-সহ সুড়ঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ একেবারে আরাম করে হাঁটার মতো জায়গা নয়।
নীচে নেমে আবার কীভাবে উঠবেন?

গুহার (Patal Bhuvaneshwar)ভিতরে দর্শনের নির্দিষ্ট অংশ ঘুরে একই পথ ধরেসিঁড়ি ও সরু passage দিয়ে উপরে উঠতে হয়। তাই নামার সময় যতটা সাবধান থাকা দরকার, ওঠার সময়ও ততটাই। বিশেষ করে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। গুহার ভিতরে কোনও অচেনা বা বন্ধ পথ নিজের ইচ্ছায় অনুসরণ করা উচিত নয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা গাইড যে পথ দেখাবেন, সেই পথেই চলা নিরাপদ। যাঁদের খুব সরু জায়গা, অন্ধকার বা দীর্ঘ সিঁড়িতে অস্বস্তি হয়, তাঁদের বিষয়টি আগে থেকেই মাথায় রাখা ভালো। হাঁটাচলায় কোনও সমস্যা থাকলে গুহায় নামার আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বর্তমানে মন্দিরের বাইরের শিলালিপি অনুসারে, লঙ্কার যুদ্ধে রাবণের মৃত্যুর পরপরই পাপদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং কুরুক্ষেত্রের মহাভারত যুদ্ধের পর রণদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে তীর্থযাত্রীদের জন্য কেবল দুটি প্রবেশদ্বার—ধর্মদ্বার এবং মোক্ষদ্বার—খোলা রয়েছে।

আরও পড়ুন – অল্প বয়সেই চুল সাদা? কোনো সংকেত দিচ্ছে শরীর?
তবে একটা বিষয় সত্যিই কৌতূহলের। গুহাটির নামই ‘পাতাল ভুবনেশ্বর’—অর্থাৎ মাটির নীচে অবস্থিত ভুবনেশ্বর বা শিবের তীর্থ। সরু অন্ধকার পথ, গভীরে প্রাকৃতিক পাথরের অদ্ভুত আকৃতি আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিবের উপাসনা—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে ঘিরে রহস্য তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
