আয়নায় মুখ দেখতে গিয়ে হঠাৎ একটা-দুটো সাদা চুল(Grey Hair) চোখে পড়ল! তারপর যতবার আয়না দেখছেন, ততবারই যেন সেই সাদা চুলটাই নজরে আসছে।বয়স এখনও ২৫ হয়নি, অথচ চুলে পাক ধরছে! তখনই মাথায় প্রশ্ন—অল্প বয়সে এভাবে চুল পেকে যাওয়া কি শরীরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনও সমস্যার ইঙ্গিত? আর একবার সাদা হয়ে গেলে কি সত্যিই আর কালো করা যায় না?

কেউ বলেন, “বেশি চিন্তা করলেই চুল পাকে”, এদিকে বাজারে আবার এমন কিছু তেল, ক্যাপসুল আর সাপ্লিমেন্টও রয়েছে, যেগুলির বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়—সাদা চুল (Grey Hair) আবার কালো হবে! কিন্তু আসল সত্যিটা কী?

ডার্মাটোলজিস্ট ডাঃ কৌশিক লাহিড়ী জানাচ্ছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় Premature Greying of Hair বা Premature Canities। দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে সাধারণত ২৫ বছরের আগে চুল পাকা(Grey Hair) শুরু হলে তাকে premature greying – হিসেবে ধরা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি “প্রচলিত সংজ্ঞা”। তবে চুলের অকালপক্বতার পিছনে একটাই কারণ থাকে না।
চুলের কালো, বাদামি বা অন্য স্বাভাবিক রঙের পিছনে রয়েছে মেলানিন। চুলের গোড়ার ফলিকলে থাকা মেলানোসাইট নামের কোষ এই রঞ্জক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এই কোষের কার্যক্ষমতা কমতে থাকলে চুলে রঙের পরিমাণও কমে যায়। তখন নতুন গজানো চুল ধূসর বা সাদা হয়ে বেরিয়ে আসে। কম বয়সে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হল বংশগত প্রবণতা।
আরও পড়ুন – পাহাড়ের কোলে মিষ্টি সুবাস! চেনেন কি ভারতের চকলেট শহরকে? ঘুরে আসুন সস্তায়!
অর্থাৎ, বাবা-মায়ের অল্প বয়সে চুল পাকার ইতিহাস থাকলে আপনার ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা বেশি। তাই একই বয়সের দু’জনের একজনের মাথায় পাক ধরলেও অন্যজনের চুল কালো থাকতে পারে—জিনের খেলাটা এখানেই।
তবে গল্পটা শুধু জিনে শেষ হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে শরীরে Vitamin B12, আয়রন/ফেরিটিন কম থাকলে বা অন্য পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও অকালপক্ব চুলের সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। থাইরয়েডের সমস্যাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার ভিটিলিগোর মতো কিছু অটোইমিউন রোগের সঙ্গেও চুলের অকালপক্বতার (Grey Hair) সম্পর্ক থাকতে পারে।

আর মানসিক চাপ?
“চিন্তা করতে করতে চুল পেকে গেল”—কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আবার এটাকে সরাসরি সত্যিও বলা যায় না। এখানে একটি নাম বারবার উঠে আসে—অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। সহজ ভাষায় বললে, শরীরে অক্সিডেটিভ ক্ষতির মাত্রা বেড়ে গেলে চুলের রং তৈরির ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।ধূমপানকেও premature greying-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে চুল নিয়ে চিন্তা করার পাশাপাশি জীবনযাপনের দিকটাও নজরে রাখা জরুরি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একবার সাদা হয়ে গেলে কি আবার কালো করা যায়?
ডাঃ কৌশিক লাহিড়ীর কথায়, “যদি Vitamin B12 বা অন্য কোনও পুষ্টির ঘাটতি থাকে, কিংবা থাইরয়েডের মতো কোনও সমস্যা ধরা পড়ে, তাহলে সেই কারণের চিকিৎসা করা জরুরি। এতে পরবর্তী সময়ে চুল পাকার (Grey Hair) গতি কমতে পারে। কিন্তু একবার সাদা হয়ে যাওয়া চুলকে স্থায়ীভাবে আবার কালো করে দেওয়ার মতো কোনও প্রমাণিত ওষুধ এখনও নেই।”এই জায়গাতেই বাজারের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তবের পার্থক্যটা বুঝতে হবে।
“Anti-grey” ক্যাপসুল, নানা সাপ্লিমেন্ট, বায়োটিন, PABA বা বিভিন্ন হারবাল তেল—এসব নিয়ে অনেক দাবি থাকলেও সাদা চুলকে নিশ্চিতভাবে আবার কালো করে দেওয়ার শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাহলে উপায়?
কারণ জানা থাকলে তার চিকিৎসা, সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ধূমপান এড়ানো—এগুলিই বাস্তবসম্মত পথ। আর সাদা চুল ঢাকতে চাইলে হেয়ার ডাই বা হেনা ব্যবহার করা যায়। তবে যে কোনও হেয়ার কালার ব্যবহারের আগে অ্যালার্জি বা ত্বকে প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
ভবিষ্যতে অবশ্য আশার আলো রয়েছে। মেলানোসাইট স্টেম সেল, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এবং চুলের রং ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু এখনও এমন কোনও চিকিৎসা সাধারণ ব্যবহারের জন্য প্রমাণিত হয়নি, যা সাদা চুলকে নিয়মিতভাবে আগের রঙে ফিরিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুন – শপিং মলে এবার উমাবরণ! হবে অষ্টমীর অঞ্জলি থেকে দশমীর সিঁদুরখেলা

তাই মাথায় প্রথম সাদা চুলটি (Grey Hair) দেখেই আতঙ্ক নয়। অনেক সময় সেটা শুধুই জিনের গল্প। কিন্তু বয়স কম থাকতেই যদি দ্রুত চুল পাকা শুরু হয়, তাহলে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
