একটা ট্রেন (Train) ছাড়ছে। কামরায় হাজার হাজার মানুষ—কেউ ঘর ছেড়েছেন, কেউ পরিবার, কেউ আবার জানেনই না সামনে কী অপেক্ষা করছে। কেউবা আবার যাচ্ছিল নিজের দেশ খুঁজতে। কিন্তু ১৯৪৭-এর সেই ট্রেনযাত্রার গল্প শুধু উদ্বাস্তুদের যাত্রার গল্প নয়। রেলগাড়িই হয়ে উঠেছিল দেশভাগের সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা এক ইতিহাসের সাক্ষী।

দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের নতুন সীমান্তের দুই দিকে শুরু হয় বিরাট মানুষের স্থানান্তর। বিশেষ করে পাঞ্জাবে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে বহু হিন্দু ও শিখ ভারতে এবং পূর্ব পাঞ্জাব থেকে বহু মুসলিম পাকিস্তানে চলে যেতে শুরু করেন। এই বিশাল মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য ট্রেন (Train) ছিল অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ১৯৪৭ সালের সরকারি নথিতেই একের পর এক ‘refugee train’ চালানোর তথ্য পাওয়া যায়।
পরিসরটা বোঝা যায় একটি সরকারি রিপোর্ট থেকেই। ২৯ অক্টোবর ১৯৪৭-এ লাহোর থেকে ৬,০০০-এর বেশি অমুসলিম এবং লায়ালপুর থেকে ৩,০০০ জন ভারতে ট্রেনে(Train) পৌঁছেছিলেন। ৩১ অক্টোবর পাকিস্তান থেকে তিনটি উদ্বাস্তু ট্রেনে ১৩,০০০ মানুষ অমৃতসরে পৌঁছন। একই সময়ে মুসলিম উদ্বাস্তুরাও ট্রেনে পাকিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন।
আরও পড়ুন – একই গান বারবার মনে পড়ে কেন?
তাই স্টেশনগুলোও হয়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী। যে মানুষগুলো কয়েক দিন আগেও একই শহর, একই বাজার, একই পাড়ায় থাকতেন, তাঁদেরই কেউ যাচ্ছেন একদিকে, কেউ অন্যদিকে। অনেকের কাছে ট্রেন (Train) মানে ছিল পরিচিত জীবন পিছনে ফেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা।
কিন্তু ট্রেনের (Train) গল্প এখানেই শেষ নয়।

ফলে ট্রেনের (Train) যাত্রা হয়ে উঠেছিল একই সঙ্গে আশা, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার প্রতীক। সরকারি নথিতে এমন ঘটনাও আছে যেখানে নিরাপত্তার কারণে উদ্বাস্তু ট্রেন চালানো বন্ধ রাখা বা সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয়েছিল। ২৯ সেপ্টেম্বরের নেহরু-সংক্রান্ত সরকারি বৈঠকের নথিতে এমনই উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে।
তবে একটা ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি—দেশভাগের প্রতিটি ট্রেনই আক্রান্ত হয়েছিল, এমন নয়। বহু মানুষ ট্রেনে করে নিরাপদে সীমান্ত পার হয়েছিলেন। আবার ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছিল, যার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক হামলার কোনও সম্পর্ক ছিল না।
তাহলে ট্রেন কেন এত বড় ইতিহাসের সাক্ষী? কারণ সেই সময় রেললাইনই ছিল ছিন্নভিন্ন মানুষের এক সীমান্ত থেকে অন্য সীমান্তে যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ। একটা কামরায় উঠে মানুষ পিছনে ফেলে আসছিল বাড়ি, পরিচিত রাস্তা, প্রতিবেশী আর বহু বছরের জীবন।
আরও পড়ুন – যে গান ছিল কিশোর কুমারের কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট!
তাই ১৯৪৭-এর ট্রেন (Train) শুধু যাত্রী বহন করেনি। তার কামরার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করেছিল একটা যুগের শেষ আর আরেকটা যুগের শুরু। সেই কারণেই দেশভাগের ইতিহাসে ট্রেন আজও শুধু পরিবহণের মাধ্যম নয়—এক গভীর স্মৃতির প্রতীক।



