২০০৭ সালের কথা মনে আছে? সঞ্জয় দত্ত, আরশাদ ওয়ার্সী, জাভেদ জাফরি এবং রিতেশ দেশমুখ অভিনীত সুপারহিট ‘ধামাল’ (Dhamaal) সিনেমাটি আমাদের কতই না হাসিয়েছে! কিন্তু রুপোলি পর্দার সেই হাসিখুশি গল্পের আড়ালে যে এত বড় এক জালিয়াতির গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কে জানত? হ্যাঁ, বর্তমানে বলিউডের অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে বহু চর্চিত ধামাল প্রতারণা মামলা-র কথা। হাসির ছবির নেপথ্যে থাকা এক কোটি টাকার কান্নার গল্প আজ দর্শকদের সামনে উন্মোচিত। প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ইন্দ্র কুমার এবং প্রযোজক অশোক ঠাকেরিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ১.৫০ কোটি টাকার বিশাল জালিয়াতির অভিযোগ!

আরও পড়ুন: ব্রহ্মাস্ত্র ২-এ দীপিকা? জোর জল্পনা
অন্ধেরি, মুম্বই-ভিত্তিক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’-এর কর্ণধার বিকাশ বলদেবরাজ সাহানির দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলা রুজু হয়েছে। বিনোদনের চাকচিক্যের আড়ালে কীভাবে একজন পরিবেশককে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, এই ঘটনা তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
প্রতিশ্রুতির নামে প্রতারণা ও শেহমারু-র গোপন চুক্তি
বিকাশ সাহানির অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর তাঁর কোম্পানি ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ মারুতি ইন্টারন্যাশনালের (অশোক ঠাকেরিয়া যার সাথে যুক্ত) সাথে একটি আইনি চুক্তি স্বাক্ষর করে। কথা ছিল—১.৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে ‘ধামাল’ (Dhamaal) ছবির ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডিস্ট্রিবিউশন, ডিজিটাল এবং কপিরাইট স্বত্ব পুরোপুরি গ্র্যান্ড মাস্টারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। চুক্তির সময় বিকাশকে স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, এই ছবির স্বত্ব এর আগে কোনো তৃতীয় পক্ষকে দেওয়া হয়নি।
কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে ঠিক এর পরেই! বিকাশবাবু পরে হতবাক হয়ে জানতে পারেন, তাঁর সাথে চুক্তি করার ঠিক চার বছর আগেই, অর্থাৎ ২০১৫ সালে, ‘ধামাল’ (Dhamaal)-এর লাইফটাইম ওটিটি এবং ডিজিটাল স্বত্ব ‘শেমারু এন্টারটেইনমেন্ট’ (Shemaroo Entertainment)-এর কাছে আগেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সোজা কথায়, একই ছবির রাইটস দু’বার বিক্রি করে কোটি টাকার মুনাফা লুটেছে প্রযোজনা সংস্থা!

বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও আইনি লড়াই
গত ১৭ অগস্ট এই প্রতারণার অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ৩১৮(৪) (প্রতারণা) এবং ৩(৫) (সম্মিলিত উদ্দেশ্যে অপরাধ) ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। বিকাশ সাহনি জানিয়েছেন, এই স্বত্ব-বিভ্রাটের কারণে বেশ কয়েকটি বড় মাপের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাথে তাঁর সংস্থার চুক্তি মাঝপথেই বাতিল হয়ে গেছে, যার ফলে তাদের কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আইনি নোটিশ পাঠালেও কোনো সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি।
মজার বিষয় হলো, ২০২০ সালেই গ্র্যান্ড মাস্টার এই ছবির সিনেমাটোগ্রাফ কপিরাইটের জন্য আবেদন করেছিল এবং ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল ভারত সরকারের কপিরাইট অফিস থেকে তাদের অফিশিয়াল শংসাপত্র (CF-5230/2023) প্রদান করা হয়।
কী বলছেন অভিযুক্ত নির্মাতারা?
এমন গুরুতর অভিযোগের পর স্বাভাবিকভাবেই শোরগোল পড়েছে বলিপাড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘মারুতি ইন্টারন্যাশনাল’-এর তরফ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, “আমরা বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করছি। আশা করছি, আলোচনার মাধ্যমে স্বত্ব সংক্রান্ত এই বিবাদ খুব শীঘ্রই পারস্পরিক সম্মতিতে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।”

আরও পড়ুন: দাম কমাতে চিনি আমদানির পথে ভারত
যে সিনেমা আমাদের মন ভালো করে দেয়, তার পেছনের সত্যটা অনেক সময়ই কতটা রূঢ় হতে পারে, এই ঘটনা তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। একদিকে যখন ২০২৬ সালের জুলাই মাসে মুক্তি পাওয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন ছবি ‘ধামাল ৪’ (Dhamaal 4) দর্শকদের নজর কাড়ছে, ঠিক তখনই পুরনো সিনেমার এই বিতর্কিত মামলা নির্মাতাদের ভাবমূর্তিতে বড়সড় ধাক্কা দিল। ব্যবসার দুনিয়ায় অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং নথিপত্র যাচাই এবং আইনি সতর্কতা যে কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এখন দেখার বিষয়, আইনি লড়াইয়ের জল ঠিক কতদূর গড়ায় এবং আসল সত্য কবে দিনের আলো দেখে!
