Homeদেশ15th August,1947: ২০০ বছরের শিকল ভাঙার রাত! স্বাধীনতার পর্দার আড়ালে কী ঘটছিল...

15th August,1947: ২০০ বছরের শিকল ভাঙার রাত! স্বাধীনতার পর্দার আড়ালে কী ঘটছিল সেদিন?

- Advertisement -spot_img

15th August,1947: ভাবুন তো দৃশ্যটা! একদিকে দিল্লির সংসদ ভবনে জওহরলাল নেহরু তাঁর ঐতিহাসিক ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’ ভাষণ দিচ্ছেন, আর অন্যদিকে পাড়ায় পাড়ায় ব্রিটিশ সাহেবরা তাড়াহুড়ো করে ট্রাঙ্কে নিজেদের ইস্ত্রি করা জামাকাপড়, রুপোর চায়ের কাপ আর গ্রামোফোন ঢোকাচ্ছে! “আরে জন, তোমার সুটকেসে আমার শেভিং কিটটা একটু ঢুকিয়ে নিও তো, কাল সকালেই কিন্তু জাহাজ!”— ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট রাতে ভাইসরয় হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ অফিসাররা কি একে অপরকে ঠিক এমন কথাই বলছিলেন? মজার বিষয় হলো, আমাদের অনেকেরই হয়তো মনে হয় ১৫ই আগস্ট (15th August,1947) ভোর হতেই সমস্ত ব্রিটিশ তল্পিতল্পা গুটিয়ে, ব্যাগপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে এই দেশ ছেড়ে একছুটে পালিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে বাস্তবটা একটু অন্যরকম।

আসল সত্যিটা হলো, ১৫ই আগস্ট (15th August,1947) সকালে ভারত স্বাধীন হলেও কোনো ইংরেজ সেদিনই পাততাড়ি গুটিয়ে এই দেশ ছেড়ে পালায়নি। উল্টে, লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে স্বাধীন ভারতেই সসম্মানে থেকে গিয়েছিলেন! ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ভারত ছাড়তে সময় নিয়েছিল আরও বেশ কয়েক মাস।

আরও পড়ুন: ৭ বদলে আজকের তেরঙ্গা !

এক যন্ত্রণাদায়ক মায়াজাল: বিলেত বনাম ভারত

অনেক ব্রিটিশ পরিবারের কাছে এই ভারতই ছিল তাঁদের একমাত্র চেনা জন্মভূমি। বিলেত বা ইংল্যান্ড ছিল তাঁদের কাছে মানচিত্রে আঁকা এক দূরবর্তী শ্যাওলাধরা দ্বীপ। কারণ তাঁদের দাদু, বাবা—সবাই এই দেশেই চাকরি করেছেন, জীবন কাটিয়েছেন।

দার্জিলিং, শিমলা কিংবা কলকাতার সেন্ট জনস চার্চের গোরস্থানগুলোয় তখন এক করুণ দৃশ্য দেখা যেত। বিদায়ের শেষ মুহূর্তে বহু ইংরেজ অফিসার ও তাঁদের স্ত্রীরা গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন নিজেদের ছোট সন্তান বা বাবা-মায়ের সমাধির সামনে। যে মাটি তাঁদের প্রিয়জনদের আঁকড়ে ধরে রেখেছে, সেই মাটিকে চিরতরে বিদায় জানানো তাঁদের জন্য সহজ ছিল না। তবে এমন অনেকেই ছিল যারা এদেশ ছেড়েই যাননি। চা বাগানের ম্যানেজার, রেলের আধিকারিক থেকে শুরু করে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়—অনেকের কাছেই ভারতের এই ধুলোমাটি হয়ে উঠেছিল নিজের দেশের চেয়েও আপন।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া এবং শেষ প্যারেড

১৯৪৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি বম্বের বিখ্যাত ‘গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’ (The Gateway of India)-র সামনে এক ঐতিহাসিক দৃশ্য রচিত হয়। ‘সোমারসেট লাইট ইনফ্যান্ট্রি’-র শেষ ব্রিটিশ রেজিমেন্টটি যখন বিদায়ী মার্চ করে জাহাজে উঠছিল, তখন ব্যান্ডে বাজছিল বিদায়ের করুণ সুর। শেষবারের মতো নামিয়ে নেওয়া হয় সগর্বে উড়তে থাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ পতাকা।

ইংরেজরা চলে যাওয়ার সময় আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে গেলেও, একেবারে খালি হাতে আমাদের ছেড়ে যায়নি। তারা দিয়ে গিয়েছিল সুবিশাল রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, ডাকব্যবস্থা, আধুনিক আমলাতন্ত্রের কাঠামো, আর অবশ্যই—বিকেলের চা, ক্রিকেট খেলা এবং ইংরেজি ভাষা।

তবে কেমন ছিল ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার আনন্দ

দুশো বছরের পরাধীনতার শিকল ভাঙার সেই মুহূর্তটা দেশবাসীর কাছে ছিল স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর। আকাশে উড়ছে স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা, রাস্তায় রাস্তায় মানুষের বাঁধভাঙা উল্লাস, আর বাতাসে মুক্তির স্বাদ। কিন্তু এই এত আনন্দের মাঝেও কি দেশের সব মানুষ হাসতে পেরেছিল?

না। ইতিহাস বইয়ের পাতায় জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের যে রঙিন ছবি আমরা দেখি, তার ঠিক আড়ালেই চাপা পড়ে আছে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় এক ট্র্যাজেডি—দেশভাগ

১৫ই আগস্টের (15th August,1947) সেই ভোরে যখন লালকেল্লায় স্বাধীনতার প্রথম রোদ্দুর এসে পড়ছে, তখন পাঞ্জাব বা বাংলার কোনো এক অখ্যাত গ্রামের বুক চিরে যাচ্ছে সিরিল রেডক্লিফের পেন্সিলের এক নির্মম দাগ। সেই মানুষগুলোর কাছে স্বাধীনতার কোনো অর্থ ছিল না। ১৫ই আগস্টের (15th August,1947) সেই সকালে যখন দিল্লির লালকেল্লায় বা কলকাতার বুকে স্বাধীনতার উৎসব চলছে, তখন হয়তো কোনো এক বাবা তাঁর ছোট্ট মেয়েকে বুকে আঁকড়ে ধরে প্রাণভয়ে ছুটছেন অচেনা ঠিকানার দিকে। পেছনে দাউদাউ করে জ্বলছে সাজানো ভিটেমাটি। শিয়ালদহ বা অমৃতসর স্টেশনে এসে থামা রক্তমাখা ট্রেনগুলো কি সেদিন স্বাধীনতার গান গাইছিল? না।

যে মা দাঙ্গায় নিজের কোলের সন্তানকে হারিয়েছে, যে পরিবার নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে এক কাপড়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার হয়েছে, তাদের কাছে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা সেদিন বড্ড অচেনা, বড্ড নিষ্ঠুর ঠেকেছিল। তারা সেদিন স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি, তাদের কাছে ১৫ই আগস্ট (15th August,1947) ছিল কেবলই এক দীর্ঘশ্বাসের দিন।

আরও পড়ুন: রক্তক্ষয়ী ১৯৪৭! দেশভাগের যন্ত্রণার মাঝেও থামেনি টলিউড! অজানা ইতিহাসে অবাক হবেন

আজ এত বছর পর যখন আমরা ১৫ই আগস্টের (15th August,1947) সকালে জাতীয় সঙ্গীত গাই, তখন সেই শেকড়-ছেঁড়া মানুষগুলোর কথা ভাবলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। যে মানুষটা নিজের জন্মভূমি, চেনা উঠোন, তুলসীতলা আর শৈশবের স্মৃতি পেছনে ফেলে সর্বস্বান্ত হয়ে কাঁটাতারের এপারে এসে দাঁড়িয়েছিল, তার চোখের সেই বোবা জলের কাছে স্বাধীনতার উৎসবও সেদিন হয়তো মাথা নিচু করে ক্ষমা চেয়েছিল। হ্যাঁ, স্বাধীনতা এসেছিল ঠিকই, তেরঙ্গা সেদিন মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়ছিল ঠিকই, কিন্তু যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সেই পতাকা উড়ছিল, সেই মাটি ভিজেছিল লাখো লাখো মানুষের তাজা রক্ত আর বাঁধভাঙা চোখের জলে। তাদের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে উৎসব ছিল না, ছিল কেবলই এক বুকফাটা হাহাকার আর একটা না-ফেরা দেশের ঠিকানা। সেই অশ্রুভেজা স্বাধীনতার ঋণ হয়ত আমরা আজও শোধ করে উঠতে পারিনি।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img
Stay Connected
f
2,614
Facebook Followers
Follow
Must Read
Related News
spot_img