ভ্রমণপিপাসু ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ সুখবর! কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে এবার ভারতেই বাস্তবের রূপ পেতে চলেছে (Desert Zoological Park and Night Safari) এশিয়ার প্রথম মরুভূমি থিম চিড়িয়াখানা এবং ‘ড্রাইভ-থ্রু নাইট সাফারি’। এতকাল রাতের নিস্তব্ধতায় বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণ চাক্ষুষ করতে আফ্রিকার জঙ্গল বা বিদেশের অত্যাধুনিক সাফারি পার্কগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু এবার সেই বুক ধুকপুক করা রোমাঞ্চের স্বাদ মিলবে খোদ গুজরাতের বুকেই! প্রকৃতিপ্রেমীদের ভ্রমণ-তালিকায় খুব শিগগিরই যুক্ত হতে চলেছে এক নতুন মেগা গন্তব্য।
গুজরাতের বনাসকাঁথা জেলার জুনা দিশায় ১০৩ হেক্টর বিশাল সরকারি জমির ওপর গড়ে উঠছে এক স্বপ্নের প্রকল্প— ‘গুজরাত ডেজার্ট জুলজিক্যাল পার্ক অ্যান্ড নাইট সাফারি’ (Desert Zoological Park and Night Safari) । ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ (Central Zoo Authority) এই মেগা প্রজেক্টের সবুজ সংকেত দিয়েছে।

আরও পড়ুন: দুর্ঘটনার থেকেও নীরব ঘাতক! যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় কাঁপছে দেশ, মুক্তির উপায় কী?
রাতের অন্ধকারে বন্যপ্রাণের রহস্যময় জগৎ
এই পার্কের সবচেয়ে বড় চমক হলো এর অভিনব দ্বৈত রূপ। এটি সাধারণ কোনো চিড়িয়াখানা নয়, বরং মরুভূমির রুক্ষ বাস্তুতন্ত্রের (Desert Ecosystem) ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আবাস। দিনের বেলায় দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে বিশাল এই পার্কের একাংশ ঘুরে দেখতে পারবেন, ঠিক যেমনটা সাধারণ চিড়িয়াখানায় হয়ে থাকে। কিন্তু আসল ম্যাজিক শুরু হবে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর!

সন্ধে নামলেই মরুভূমির ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে শুরু হবে রোমাঞ্চকর ‘রাত সাফারি’ বা নাইট সাফারি। পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে ৫টি বিশেষ সাফারি এনক্লোজার। রাতের অন্ধকারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে জিপে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবেন পর্যটকরা। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো— চারদিকে শুনশান নীরবতা, চাঁদের আলো আর গাড়ির মৃদু হেডলাইটে হঠাৎ ফুটে উঠল শিকারের সন্ধানে বের হওয়া এক রাজকীয় সিংহ বা জ্বলজ্বলে চোখের কোনো হায়না! নিশাচর প্রাণীদের তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখার এই সুযোগ দিনের বেলার সাধারণ সাফারিতে একেবারেই মেলে না।
দেশ-বিদেশের প্রায় ৩ হাজার বন্যপ্রাণের মেলা
প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হতে চলেছে এই পার্ক। জানা গিয়েছে, প্রায় ২,৭০০টি দেশি ও বিদেশি প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে এই চিড়িয়াখানা। ডানা ঝাপটানো ৮৩টিরও বেশি প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকবে চারপাশ। শুধু কি দেশি? বিশ্বের তিন মহাদেশের বন্যপ্রাণের দেখা মিলবে এক ছাদের তলায়!

- ভারতের নিজস্ব রত্নভাণ্ডার: দেখা মিলবে রাজকীয় এশীয় সিংহ, ক্ষিপ্র চিতাবাঘ, চিঙ্কারা, ব্ল্যাকবাক, ভারতীয় বুনো গাধা, স্লথ ভালুক, কারাকাল, ভারতীয় নেকড়ে, শিয়াল, হায়না, এবং ভারতীয় মরু-শিয়ালের মতো দেশি প্রাণীদের।
- আফ্রিকার বন্য রোমাঞ্চ: সুদূর আফ্রিকা থেকে এই মরু-উদ্যানে আনা হচ্ছে অ্যাঙ্গোলান জিরাফ, গ্রেভির জেব্রা, কালো গন্ডার, শিম্পাঞ্জি, আফ্রিকান চিতা, আফ্রিকান সিংহ, সিমিটার অরিক্স, স্প্রিংবক, মিরক্যাট, বাদুড়-কান শিয়াল (Bat-Eared Fox) এবং বিশাল উটপাখি।
- অস্ট্রেলিয়ার চমক: বাদ যাচ্ছে না অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীরাও। এই পার্কের বাসিন্দা হতে চলেছে ক্যাঙ্গারু, ইমু এবং ওয়ালাবি।
শুধু পর্যটন নয়, পরিবেশ সংরক্ষণের এক নতুন মডেল
গুজরাত বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৫৪২ কোটি ১৪ লক্ষ টাকা বাজেটের এই বিপুল কর্মযজ্ঞ শুধু পর্যটকদের বিনোদনের জন্য নয়। বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসন এবং পরিবেশ শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে এই পার্ক। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সাহায্যে এমন এক ইকো-সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে প্রাণীরা খাঁচাবন্দি বন্দিদশা নয়, বরং প্রাকৃতিক স্বাধীনতার স্বাদ পাবে। আহত বা অসুস্থ পশুপাখিদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের প্রয়োজনে আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকবে এখানে।
পর্যটন মানচিত্রে ভারতের নতুন মাইলফলক
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু গুজরাত নয়, গোটা ভারতের বন্যপ্রাণী পর্যটনে (Wildlife Tourism) এক নতুন যুগের সূচনা হবে। মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য, আধুনিক পরিকাঠামো এবং রাতের অন্ধকারে বন্যপ্রাণের রহস্যময় হাতছানি— সব মিলিয়ে জুনা দিশার এই মরু-উদ্যান আগামী দিনে বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র হতে চলেছে।
আরও পড়ুন: Vimal বিজ্ঞাপনে তিন তারকাকে নোটিস, ১৫ দিনের জবাব তলব
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। খুব শিগগিরই বন্যপ্রাণী প্রেমীরা ব্যাগ প্যাক করে বেরিয়ে পড়তে পারবেন এক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। রাতের মরুভূমিতে নিশাচরদের ডেরায় প্রবেশের এই হাতছানি কি আপনি এড়াতে পারবেন?



