সঙ্গীতের কোনও কাঁটাতার হয় না, সুরের কোনও সীমানা থাকে না। রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে প্রায় এক দশক ধরে আতিফ আসলামের (Atif Aslam) ভারতে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও, ভারতীয় শ্রোতাদের হৃদয়ে তাঁর গানের আবেদন আজও অমলিন। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে নিজের বলিউড কেরিয়ার এবং ভারতের এই দীর্ঘকালীন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিস্ফোরক অথচ আবেগঘন মন্তব্য করলেন জনপ্রিয় এই পাকিস্তানি গায়ক।
সম্প্রতি ‘ওয়ান অন ওয়ান উইথ ক্রিস ফেড’ (One on One with Kris Fade) নামক ইউটিউব টক শো-তে এসে আতিফ আসলাম (Atif Aslam) জানান, ভারতে কাজ করতে না পারার জন্য তাঁর মনে বিন্দুমাত্র কোনও আক্ষেপ বা ক্ষোভ নেই। বরং, এই বাধাকেই তিনি নিজের সঙ্গীতজীবনের অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট বা আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন!
আতিফের (Atif Aslam) কথায়, ভারতে কাজ হারানো নিয়ে তাঁর কোনও দুঃখ নেই। সত্যি বলতে, যারা তাঁর উপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, তাঁদের তিনি উল্টে ধন্যবাদ জানাতে চান। কিন্তু কেন এমন মন্তব্য? গায়ক জানান, বলিউডের প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিজের স্বাধীন সত্তাকে যেন কোথাও হারিয়ে ফেলছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা না এলে তিনি হয়তো নিজের মৌলিক গান তৈরির দিকে এতটা মন দিতে পারতেন না এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ পেতেন না।

আরও পড়ুন: করণ জোহরের সবচেয়ে বিতর্কিত ছবি! শুধুই কি পরকীয়া নাকি ব্যর্থ দাম্পত্যের রূঢ় বাস্তব?
ভিপিএন ও সিডি: ভারতীয় অনুরাগীদের অটুট প্রেম
স্টুডিওর দরজা হয়তো বন্ধ করা যায়, কিন্তু শ্রোতার কান আর হৃদয়কে আটকাবে কে? আতিফ জানান, ভারতে তাঁর নতুন গান আনুষ্ঠানিকভাবে রিলিজ না হলেও, তাঁর ভারতীয় অনুরাগীরা ঠিকই তাঁর গান খুঁজে নেন।
কীভাবে? গায়কের কথায়, প্রযুক্তির যুগে সীমানা এখন অনেকটাই ফিকে। ভারতীয় ভক্তরা ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে তাঁর নতুন গান শুনছেন। এমনকি পুরনো সিডি কপি করে একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আতিফ (Atif Aslam) যদিও পাইরেসিকে কখনোই সমর্থন করেন না, তবে তিনি মনে করেন— সঙ্গীতের নিজস্ব একটা গতি আছে। যার যেখানে পৌঁছানোর কথা, সে ঠিক সেখানেই তার পথ করে নেয়।
ভারতীয় ভক্তদের জন্য বিশেষ বার্তা দিয়ে আতিফ (Atif Aslam) বলেছেন- “এই পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের মন খারাপ বা দুঃখ পাওয়ার কোনও কারণ নেই। ভারতে কাজ করার সুযোগ আমি মিস করি না, তবে ওখানকার মানুষদের আমি সত্যিই খুব মিস করি।”

কেন এই রাজনৈতিক দূরত্ব?
এই নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে রয়েছে দুই দেশের তিক্ত রাজনৈতিক সম্পর্ক। ২০১৬ সালে উরি জঙ্গি হামলার পর ‘ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার্স প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (IMPPA) পাকিস্তানি শিল্পীদের ভারতে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর এই নিষেধাজ্ঞা আরও কড়া হয় এবং ‘অল ইন্ডিয়া সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (AICWA) সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি শিল্পীদের বয়কটের ডাক দেয়।
তবে আতিফ (Atif Aslam) মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু ভারত নয়, পাকিস্তানেও ভারতীয় শিল্পীদের কাজের ওপর একইরকম বিধিনিষেধ রয়েছে। অর্থাৎ, রাজনীতির আঁচ সমানভাবে লেগেছে দুই দেশেরই বিনোদন জগতে।

‘আদত’ থেকে ‘ও সাথী’ — এক সোনালি সফর
পাকিস্তানি রক ব্যান্ড ‘জল’ (Jal)-এর আইকনিক গান ‘আদত’ (Addat) এবং ২০০৪ সালের ‘জলপরী’ (Jal Pari) অ্যালবামের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন আতিফ (Atif Aslam) । এরপর বলিউডে তাঁর প্রবেশ এবং তারপরের ইতিহাস সকলেরই জানা। ‘ওহ লমহে’ (Woh Lamhe), ‘তেরে বিন’ (Tere Bin), ‘পহেলি নজর মে’ (Pehli Nazar Mein), ‘তু জানে না’ (Tu Jaane Na), ‘তেরে হোনে লাগা হুঁ’ (Tera Hone Laga Hoon), ‘জিনা জিনা’ (Jeena Jeena), এবং ‘দিল দিয়াঁ গল্লাঁ’ (Dil Diyan Gallan)-র মতো একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গানই যেন ভারতীয় রোমান্টিক সঙ্গীতের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ২০১৮ সালে রিলিজ হওয়া ‘বাগী ২’ ছবির ‘ও সাথী’ (O Saathi) ছিল বলিউডে তাঁর গাওয়া শেষ দিকের হিট গানগুলোর অন্যতম।
আরও পড়ুন: পুরনো জিমেল আইডি নিয়ে লজ্জা? নতুন অ্যাকাউন্ট ছাড়াই বদলে ফেলুন এইভাবে!
আজ হয়তো বলিউডের রেকর্ডিং স্টুডিওতে আতিফ আসলামের (Atif Aslam) যাতায়াত নেই। কিন্তু তাঁর কথায় একটা বিষয় পরিষ্কার— কাজের দরজা হয়তো বন্ধ হয়েছে, কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের শ্রোতাদের মধ্যে তাঁর সুরের যে অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়েছিল, তা আজও অটুট। গানের জগতে সীমানা যে শুধুই মানচিত্রের দাগ, আতিফ যেন হাসিমুখে সেটাই ফের প্রমাণ করে দিলেন।



