১৫ অগস্ট হোক বা ২৬ জানুয়ারির—জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঠিক পরক্ষণেই হাওয়ায় ভেসে আসে এক গম্ভীর গর্জন। হ্যাঁ, আমরা ভারতের বিখ্যাত ২১ গান স্যালুট (Gun Salute) বা ২১ বার তোপধ্বনির কথাই বলছি। দিল্লির লালকেল্লার প্রাঙ্গণ হোক বা কর্তব্য পথ, জাতীয় সঙ্গীতের সুরের সঙ্গে নিখুঁত ছন্দে মিলিয়ে পরপর ২১ বার কামানের এই গগনভেদী গর্জন প্রত্যেক ভারতবাসীর গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কিন্তু কখনও কি আপনার মনে এই প্রশ্ন জেগেছে, এই সংখ্যাটা ঠিক ২১ কেন? ২০, ২২ বা ৫০ তো হতে পারত! চলুন, আজ এই শতাব্দীপ্রাচীন সামরিক প্রথার এক রোমাঞ্চকর এবং অজানা ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখা যাক।
সমুদ্রের বুক থেকে জন্ম নেওয়া এক শান্তির বার্তা
এই প্রথার শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের টাইম মেশিনে চেপে পিছিয়ে যেতে হবে কয়েক শতাব্দী আগে, ইউরোপের বুকে। তখন সমুদ্রপথে দস্যুতা আর নৌযুদ্ধ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেই সময় কোনও যুদ্ধজাহাজ যখন বন্ধু দেশের বন্দরে প্রবেশ করত, তখন তারা নিজেদের কামানের সব গোলা সমুদ্রের দিকে ছুড়ে দিত। এর একটাই অর্থ ছিল— “আমাদের অস্ত্র খালি, আমরা শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছি, আমরা বিন্দুমাত্র আক্রমণাত্মক নই।”

আরও পড়ুন: ‘জনগণমন’-এর আগে ‘বন্দে মাতরম’! স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় নতুন চমক কেন্দ্রের
সেই যুগে জাহাজে সাধারণত ৭টি কামান থাকত। অন্যদিকে, স্থলভাগের সেনাবাহিনীর হাতে থাকা ব্যাটারিগুলো ওই ৭টি কামানের সম্মানে ৩টি করে গোলা ছুড়তে পারত। অর্থাৎ, ৭-কে ৩ দিয়ে গুণ করলে দাঁড়ায় ২১! এভাবেই এককালীন বন্ধুত্বের বার্তা ধীরে ধীরে পরিণত হলো রাষ্ট্রপ্রধানদের দেওয়া সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে।
রাজকীয় প্রথা থেকে স্বাধীন ভারতের গর্ব
ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এই তোপধ্বনির প্রথাটি মূলত পদমর্যাদা বা ‘হায়ারার্কি’ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, ভাইসরয় বা দেশীয় রাজাদের সম্মান জানাতে এই গান স্যালুট (Gun Salute) দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারত যখন স্বাধীনতার মুক্ত বাতাস বুকে টেনে নিল, তখন এই ঔপনিবেশিক নিয়মের খোলস পালটে ফেলা হলো।

স্বাধীন ভারত এই ঐতিহ্যকে বাতিল করেনি, বরং তাকে এক নতুন এবং গর্বের মোড়কে সাজিয়ে তুলেছে। আজকের দিনে এই তোপধ্বনি কোনও রাজা বা ব্যক্তিবিশেষের জন্য নয়, বরং এটি ভারতের অটুট সার্বভৌমত্ব, শক্তিশালী গণতন্ত্র এবং গর্বের তেরঙ্গা পতাকার প্রতি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন।
১৫ অগস্ট বনাম ২৬ জানুয়ারি: কেন দু’দিনই কামানের গর্জন?
অনেকের মনেই খটকা লাগে, স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস—দুই বিশেষ দিনেই কেন এই প্রথা পালন করা হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দিন দুটির তাৎপর্যের মধ্যে।

১৫ অগস্ট আমাদের শেকল ভাঙার দিন। এই দিন লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী যখন পতাকা উত্তোলন করেন, তখন যে তোপধ্বনি (Gun Salute) দেওয়া হয়, তা ব্রিটিশ শাসনের অন্ধকার দূর করে স্বাধীনতার আলো নিয়ে আসার প্রতীক। অন্যদিকে, ২৬ জানুয়ারি হলো প্রজাতন্ত্র দিবস। এই দিন কর্তব্য পথে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে যে তোপধ্বনি (Gun Salute) হয়, তা আমাদের পবিত্র সংবিধান এবং প্রজাতান্ত্রিক শক্তির চূড়ান্ত উদ্যাপন।
সত্যিই কি ২১টি পেল্লাই কামান সারিবদ্ধ থাকে?
নামটা শুনলে মনে হতেই পারে, হয়তো ২১টি আলাদা পেল্লাই সাইজের কামান পরপর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো থাকে। কিন্তু বাস্তবটা একটু অন্যরকম!

ভারতের আনুষ্ঠানিক নিয়মে ২১টি আলাদা কামান ব্যবহার করা হয় না। বরং নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি ‘ফিল্ড গান’ বা কামান থেকে অত্যন্ত নিখুঁত সময়ের ব্যবধানে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মোট ২১টি গোলা ছোড়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ৫২ সেকেন্ডের জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে এমনভাবে সিঙ্ক (Sync) করা থাকে যে, গান শুরু হওয়ার সঙ্গে প্রথম গোলা এবং গান শেষ হওয়ার ঠিক সঙ্গেই ২১তম গোলাটি ফায়ার করা হয়। এটি ভারতীয় সেনার চূড়ান্ত শৃঙ্খলার এক অনবদ্য নিদর্শন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যে যুক্ত হয়েছে নতুন পালক। ব্রিটিশ আমলের ২৫-পাউন্ডার কামানের জায়গা এখন নিচ্ছে দেশীয় প্রযুক্তি। ২০২৩ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে এই সম্মানের জন্য প্রথমবার ব্যবহার করা শুরু হয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ১০৫ মিমি ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড গান’ (105mm Indian Field Guns) । অর্থাৎ, এখন কামানের গর্জনে শুধুই ইতিহাস আর স্মৃতি নেই, মিশে আছে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘আত্মনির্ভর’ হয়ে ওঠার এক জোরালো বার্তাও।
আরও পড়ুন: অপ্রতিরোধ্য ভারত! ‘অগ্নি-৪’-এর গর্জনে আরও মজবুত দেশের সুরক্ষাবলয়
পরিশেষে বলা যায়, এই সামরিক প্রথা নিছকই কোনও শব্দবাজি বা যান্ত্রিক নিয়ম নয়। এটি একটি স্বাধীন দেশের আত্মপরিচয়। যখন বাতাসে বারুদের গন্ধ আর কামানের গুরুগম্ভীর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত দেশপ্রেমের শিহরণ জাগিয়ে তোলে। শতবর্ষ পুরনো এক রীতি আজ এভাবেই আধুনিক ভারতের গর্বের প্রতীক হয়ে সগৌরবে টিকে রয়েছে।



