হাসলে (Laughter) নাকি মন ভালো থাকে—এ কথা আমরা হামেশাই শুনি। অনেকসময়ই আড্ডায় হঠাৎ এমন একটা কথা উঠল যে সবাই হেসে উঠলেন। কয়েক মুহূর্তের সেই হাসি কি শুধু মনটাই ভালো করল, নাকি শরীরের ভেতরেও তার কোনও প্রভাব পড়ল? হাসি দিয়ে কি সত্যিই হার্টের যত্ন নেওয়া যায়? নাকি এটা শুধু কথার কথা? বিজ্ঞানের উত্তর শুনলে কিন্তু ব্যাপারটা বেশ মজার!

হাসি (laughter) আর হার্টের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে বহুবার। তবে শুরুতেই একটা ভুল ধারণা সরিয়ে রাখা দরকার—হাসি হার্টের রোগ সারিয়ে দেয় বা শুধু বেশি হাসলেই হৃদ্রোগ হবে না, এমন প্রমাণ বিজ্ঞান এখনও দেয়নি। কিন্তু হাসির সঙ্গে শরীরের স্ট্রেস-প্রতিক্রিয়ার একটা যোগ অবশ্যই আছে।
হাসলে শরীরে কী হয়?
জোরে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসার সময় শরীরের স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রে সাময়িক পরিবর্তন হয়। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হাসি শোনার পর শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক’ কার্যকলাপ বাড়তে পারে—যা শরীরকে চাপের পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি শরীরের ‘রিল্যাক্সেশন’ বা শিথিলতার সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক কার্যকলাপ বাড়াতে পারে। অর্থাৎ, সারাদিনের টেনশনের মাঝে কয়েক মিনিটের হাসি (laughter) শরীরকে কিছুটা ‘রিল্যাক্স’ হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।

আরও পড়ুন – ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক চাকরি! কীভাবে গড়বেন ভবিষ্যতের ‘গ্লোবাল ক্যারিয়ার’? জানুন আজই
হাসলে রক্তনালী একটু ‘খুলে’ যেতে পারে
২০১০ সালে American Journal of Cardiology-তে প্রকাশিত একটি ছোট গবেষণায় ১৭ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। একদিন তাঁদের ৩০ মিনিটের কমেডি সিনেমা এবং অন্যদিন একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়।
ফল বেশ চমকপ্রদ। কমেডি দেখার পর বাহুর ধমনীর flow-mediated dilation (FMD) প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছিল। সহজ ভাষায়, রক্তনালী রক্তপ্রবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা ভালোভাবে প্রসারিত হতে পারছে, FMD দিয়ে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। একই গবেষণায় ঘাড়ের ধমনীর arterial compliance-ও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছিল। তবে এই পরিবর্তন ছিল সাময়িক—২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
হার্টের উপর হাসির প্রভাব কিন্তু সবসময় ‘কম’ নয়
আরও মজার বিষয় হল, হাসির (laughter) মুহূর্তে হার্ট রেট ও সিস্টোলিক রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়েও যেতে পারে। অর্থাৎ হাসলেই সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ কমে যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। একটি গবেষণায় হাসার সময় সিস্টোলিক রক্তচাপ ১১৫ থেকে ১২৭ mmHg পর্যন্ত উঠেছিল। তবে হাসি থামার পর শরীরের স্বাভাবিক ‘রিল্যাক্সেশন’ প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আসল খেলাটা স্ট্রেস হরমোনে?
সম্ভবত এখানেই হাসির (laughter) সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। ২০২৩ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ৮টি গবেষণা এবং মোট ৩১৫ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, হাসির হস্তক্ষেপের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের তুলনায় কর্টিসল গড়ে প্রায় ৩১.৯ শতাংশ কমেছিল। এমনকি একবারের হাসির সেশনেও কর্টিসল কমার প্রমাণ পাওয়া যায়। কর্টিসল শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রেস-হরমোন। তাই হাসির মাধ্যমে স্ট্রেস-প্রতিক্রিয়া কিছুটা কমতে পারা হার্টের জন্য পরোক্ষভাবে উপকারী হতে পারে।
তাহলে প্রতিদিন হাসলেই হৃদ্রোগ হবে না?
জাপানে বয়স্ক মানুষের উপর করা একটি বড় পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা হয়েছিল, যারা দৈনন্দিন জীবনে খুব কম হাসেন, তাঁদের হৃদ্রোগের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন। সেখানে কম হাসার সঙ্গে হৃদ্রোগের বেশি উপস্থিতির একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। কিন্তু সেটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা, তাই কম হাসার কারণেই হৃদ্রোগ হয়েছে—এ কথা প্রমাণ করে না।

তাই বিজ্ঞানসম্মত উত্তর হল—হাসি (laughter) শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া ও রক্তনালীর কার্যকারিতায় স্বল্পমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু শুধু হাসিকে হৃদ্রোগ প্রতিরোধের উপায় বলা যায় না।
আরও পড়ুন – শুধু স্বর্ণমন্দির – জালিয়ানওয়ালাবাগ নয়, পাঞ্জাবে আছে আরও চমক!
হার্ট ভালো রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রক্তচাপ-কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মতো প্রমাণিত অভ্যাসই মূল। দিনের শেষে একটা বিষয় মানতেই হয়—হাসি (laughter) হয়তো হার্টের ওষুধ নয়, কিন্তু মন ও শরীরকে স্বস্তি দেওয়ার একেবারে বিনামূল্যের অভ্যাস। তাই সুযোগ পেলেই হাসুন। শুধু হার্টের জন্য নয়, ভালো থাকার জন্যও।



