শিব (Shiv) মানেই বেলপাতা, ধুতুরা, আকন্দ, নীলকণ্ঠ —এই ধারণাই আমাদের ছোটবেলা থেকে। কিন্তু কখনও কি খেয়াল করেছেন, কোথাও কোথাও মহাদেবের পুজোয় লাল টকটকে জবা ফুলও দেওয়া হয়? তাহলে কি জবা শিবের পুজোয় নিষিদ্ধ নয়? নাকি শিবকে জবা দেওয়া নিয়ে আমরা এতদিন ভুলই জেনে এসেছি? আর ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত লিঙ্গরাজ মন্দিরে এই ফুলের ব্যবহারই বা কেন?

আসলে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। প্রথমেই সবচেয়ে জরুরি কথা— শিবকে(Shiv) জবা ফুল দেওয়া নিষিদ্ধ, এমন কোনও সর্বজনীন শাস্ত্রীয় নিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং শিবপুরাণের রুদ্রসংহিতা-র ‘শিবপূজার নির্দেশ’ অধ্যায়ে বিভিন্ন ফুল দিয়ে শিবের উপাসনার কথা বলা হয়েছে। সেখানে কোন ফুল কতটা নিবেদন করলে কী ফল পাওয়া যায়, তারও উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন – ম্যাজিক মেকওভার! আপনার অবহেলিত বারান্দাকে করে তুলুন বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর কোণ
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একই অধ্যায়ের পরের অংশে ‘জপা’ ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। সংস্কৃত জপা বলতে সাধারণভাবে জবা বা hibiscus-কে বোঝানো হয়। সেখানে শিবপুজোয় জপা ফুল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে এবং তার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ফলের কথাও উল্লেখ।
তাহলে বেলপাতা, ধুতুরা আর আকন্দের এত নাম কেন? কারণ এগুলি শিবপুজোর সঙ্গে ভারতীয় লোকাচার ও বিভিন্ন মন্দির-পরম্পরায় অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বেলপাতা শিবপুজোর অন্যতম পরিচিত উপাচার। তবে ‘শিবকে (Shiv) শুধু এই কয়েকটি ফুলই দেওয়া যায়’—এমন সরল নিয়ম শাস্ত্রের সব জায়গায় নেই। শিবপুরাণের পুজাবিধিতেই বিভিন্ন ফুল ও পত্র নিবেদনের কথা পাওয়া যায়।
তাহলে লিঙ্গরাজ মন্দিরে জবার প্রসঙ্গ কেন আসে?
ওড়িশা সরকারের পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লিঙ্গরাজ মন্দির ১১শ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মন্দির এবং ওড়িশার মন্দির-স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ আসলে সাধারণ শিবমন্দিরের মতো শুধু শৈব ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখানকার দেবতা ‘হরিহর’—অর্থাৎ শিব (Shiv) ও বিষ্ণুর সমন্বিত রূপ। মন্দিরটির নিজস্ব প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানও রয়েছে।
কিন্তু এখানে একটা সাবধানতার জায়গা আছে। লিঙ্গরাজ মন্দিরে জবা ফুল ঠিক কোন শাস্ত্রীয় কারণে দেওয়া হয়—এ বিষয়ে কোনওস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না।
আর একটি প্রচলিত ধারণা আছে—লাল জবা নাকি শুধু কালী বা শক্তির দেবদেবীর ফুল। সেটিও পুরোপুরি ঠিক নয়। জবা শক্তি-পুজোয় অত্যন্ত পরিচিত হলেও শিবপুজোয় জবার উল্লেখ প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যে পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, জবা শিবকে (Shiv) দেওয়া যায় কি? হ্যাঁ, শাস্ত্রে তার ভিত্তি আছে। তবে প্রতিটি শিবমন্দিরে জবা দেওয়া বাধ্যতামূলকও নয়। কোন ফুল দেবতাকে দেওয়া হবে, তা অনেক সময় নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মন্দিরের নিজস্ব আচার, অঞ্চল এবং দীর্ঘদিনের পরম্পরার উপর।
আরও পড়ুন – নৌযুদ্ধ থেকে লালকেল্লার প্রাঙ্গণ! তেরঙ্গাকে সম্মান জানাতে কেন দেওয়া হয় ‘২১ গান স্যালুট’?
তাই পরের বার শিবের (Shiv) পুজোয় লাল জবা দেখলে অবাক হওয়ার কারণ নেই। বেলপাতাই শিবপুজোর শেষ কথা নয়—প্রাচীন শাস্ত্রেও শিবের পুজোয় নানা ফুলের উল্লেখ রয়েছে। তবে কোনও নির্দিষ্ট মন্দিরে পুজো দিতে গেলে সেই মন্দিরের প্রচলিত বিধি ও পুরোহিতের নির্দেশই মানা উচিত। কারণ দেবতার পুজোয় শুধু ফুলের নাম নয়, স্থানীয় রীতি ও দীর্ঘদিনের মন্দির-পরম্পরারও আলাদা গুরুত্ব আছে।



