আজ যে তেরঙ্গা (Flag) দেখলেই চোখের সামনে ভারতের (INDIA) ছবি ভেসে ওঠে, জানেন কি—এই পতাকার (Flag) চেহারা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি! বদলেছে বারবার । স্বাধীনতার আগে প্রায় চার দশকে বদলেছে পতাকার রং, প্রতীক, এমনকী তার ভাবনাও। কোথাও বজ্র, কোথাও পদ্ম, কোথাও সপ্তর্ষি, কোথাও চরকা—শেষে এসে জায়গা নিয়েছে অশোকচক্র। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন যত এগিয়েছে, পতাকার নকশাও তত বদলেছে।

১. ১৯০৪ — নিবেদিতার পতাকা
ভারতের জাতীয় পতাকার (Flag) প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য নকশাগুলির একটি তৈরি করেন স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা সিস্টার নিবেদিতা। ১৯০৪ সালে তিনি একটি পতাকার নকশা ভাবেন। পতাকাটি ছিল লাল, তার উপর হলুদ বজ্র বা Vajra-র প্রতীক। ‘বন্দে মাতরম্’ বাংলায় লেখা ছিল। নকশাটিতে আত্মত্যাগ ও শক্তির ভাবনা তুলে ধরা হয়েছিল। সরকারি PIB-ও জানায়, নিবেদিতা ১৯০৪ সালে বজ্রকে কেন্দ্রে রেখে এই পতাকার নকশা করেছিলেন এবং তাঁর ছাত্রীরা তাতে বাংলায় ‘বন্দে মাতরম্’ সূচিকর্ম করেছিলেন।
আরও পড়ুন – টাকার গদিতে কালীন ভাইয়া! ‘মির্জাপুর দ্য মুভি’-তে কার ক্যাশবাক্সে ঢুকল কত কোটি?
২. ১৯০৬ — প্রথম তেরঙা ভাবনা
এরপর আসে কলকাতার পতাকা (Flag)। ৭ আগস্ট ১৯০৬, পার্সি বাগান স্কোয়ারে এটি উত্তোলন করা হয়। পতাকায় ছিল সবুজ, হলুদ ও লাল—তিনটি অনুভূমিক অংশ। উপরের সবুজ অংশে ছিল আটটি পদ্ম, মাঝের হলুদ অংশে লেখা ছিল ‘বন্দে মাতরম্’, আর নিচের লাল অংশে ছিল সূর্য ও অর্ধচন্দ্রের প্রতীক। সরকারি প্রকাশনা এটিকেই ১৯০৬ সালের প্রথম জাতীয় পতাকা হিসেবে উল্লেখ করে।
৩. ১৯০৭ — ভিকাজি কামার পতাকা
১৯০৭ সালে পতাকার (Flag) আরেক রূপ দেখা যায়। ম্যাডাম ভিকাজি কামা ও বিদেশে থাকা বিপ্লবীরা এই পতাকা ব্যবহার করেন। এটি ১৯০৬-এর পতাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল এবং প্যারিসে উত্তোলন করা হয়। পরে জার্মানির স্টুটগার্টে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনেও ভারতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে এই পতাকা প্রদর্শিত হয়।
৪. ১৯১৭ — হোম রুলের পতাকা
এবার নকশা একেবারে বদলে গেল। অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলকের হোম রুল আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত পতাকায় (Flag) ছিল লাল ও সবুজের মোট নয়টি অনুভূমিক দাগ—পাঁচটি লাল, চারটি সবুজ। তার উপর ছিল সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাতটি তারা। এক কোণে ছিল Union Jack, আর অন্য অংশে ছিল চাঁদ ও তারা। অর্থাৎ এই পতাকায় ভারতীয় প্রতীকের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
৫. ১৯২১ — এল চরকা
১৯২১ সালে বিজয়ওয়াড়ার কংগ্রেস অধিবেশনে পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া একটি নতুন পতাকার (Flag) নকশা নিয়ে আসেন। প্রথম নকশায় ছিল লাল ও সবুজ—দুটি রং। মহাত্মা গান্ধীর পরামর্শে পরে সাদা অংশ এবং চরকা যোগ করা হয়। চরকা তখন স্বনির্ভরতা, দেশীয় শিল্প এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
৬. ১৯৩১ — গেরুয়া-সাদা-সবুজ তেরঙ্গা
১৯৩১ সাল ছিল বড় পরিবর্তনের বছর। গ্রহণ করা হয় গেরুয়া, সাদা ও সবুজ—তিনটি সমান অনুভূমিক অংশের পতাকা। মাঝখানে ছিল চরকা। এই পতাকাকে (Flag) বর্তমান তেরঙ্গার সরাসরি পূর্বসূরি বলা যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই তিন রংকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা না করার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছিল।
৭. ১৯৪৭ — এল আজকের তেরঙ্গা

স্বাধীনতার ঠিক আগে, ২২ জুলাই ১৯৪৭, সংবিধান সভা বর্তমান জাতীয় পতাকার (Flag) নকশা গ্রহণ করে। গেরুয়া উপরে, সাদা মাঝখানে, সবুজ নিচে—এই বিন্যাস ১৯৩১-এর পতাকার মতোই থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে মাঝখানে। চরকার জায়গায় বসে সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র—গাঢ় নীল ২৪-কাঁটাযুক্ত অশোকচক্র।
আরও পড়ুন – উইকেন্ডে কম খরচে কোথায়?

অর্থাৎ, আজকের তেরঙ্গা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। পতাকা শুধু কাপড়ের টুকরো নয়—স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতিটি বাঁকের গল্প যেন তার রঙ আর প্রতীকের মধ্যে লুকিয়ে আছে। এই পতাকার ইতিহাস আসলে স্বাধীনতা আন্দোলনেরই এক ছোট্ট, রঙিন ইতিহাস।



