আজ ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস Independence Day। তবে একটু গভীর চিন্তা করে বলুন তো আজকের এই দিনটা আপনার কাছে ঠিক কতটা স্পেশাল? ক্যালেন্ডারের পাতায় জ্বলজ্বল করা একটা লাল দাগ, স্কুল-কলেজ-অফিস থেকে পাওয়া একটা আস্ত দিনের ছুটি, দুপুরে জমিয়ে খাসির মাংস আর ভাত ঘুম—আমাদের কাছে কি স্বাধীনতার সংজ্ঞা আজ এখানেই এসে ঠেকেছে?
সকাল সকাল পাড়ার মোড়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মাইকে বাজতে থাকা দেশাত্মবোধক গান, জিলেপির মিষ্টি সুবাস, টিভিতে পুরনো কোনো সিনেমা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তেরঙ্গার ছবি Independence Day—এসবের বাইরে গিয়ে আমরা কি সত্যি উপলব্ধি করতে পারছি আজকের এই মুক্ত বাতাসের প্রকৃত মূল্য?
সামাজিক মাধ্যমের মোড়ক বনাম বাস্তব চেতনা
আজকের ডিজিটাল যুগে স্বাধীনতার আবেগ অনেকটাই আটকে গেছে সোশাল মিডিয়া প্রোফাইলের ছবি পরিবর্তন কিংবা একদিনের ডিজিটাল স্ট্যাটাস আপডেটে। ছুটির দিনে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো অবশ্যই মন্দ নয়, কিন্তু সেই উদযাপনের ভিড়ে যদি মূল ইতিহাসই ঢাকা পড়ে যায়, তবে তা জাতি হিসেবে আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমাদের আধুনিক দেশপ্রেমের কোটা এতে পূর্ণ হয়ে গেলেও এই দিনটার পেছনে যে কতটা রক্ত, কতটা কান্না আর হাহাকার লুকিয়ে আছে, তা কি আমরা সত্যিই মনে রেখেছি?
আরও পড়ুন – দেশভাগের সময় ট্রেন হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের সাক্ষী!

স্বাধীনতা এসেছিল, তবে একা আসেনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ‘দেশভাগ’ নামক এক ভয়াল অভিশাপ। বাংলা আর পাঞ্জাবের বুক চিরে চলে গিয়েছিল এক নির্মম কাঁটাতার। ভিটেমাটি হারানো লাখো মানুষের চোখের জল, ছিন্নমূল পরিবারের আর্তনাদ আর দাঙ্গার রক্তস্নাত পথে হেঁটে এসেছিল এই স্বাধীনতা। তাই স্বাধীনতা মানে কেবল উল্লাস নয়, স্বাধীনতা মানে এক গভীর দীর্ঘশ্বাসও বটে। পূর্ববঙ্গের ফেলে আসা নদী, মাঠ আর উঠোনের স্মৃতি আজও কাঁদায় সেই প্রজন্মের মানুষকে। তাঁদের কাছে ১৫ই আগস্ট কি নিছকই একটা ছুটির দিন হতে পারে?
আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবহেলা?
একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং, মাস্টারদা সূর্য সেন কিংবা বিনয়-বাদল-দীনেশের কথা। হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরার সময় তাঁরা কি ভেবেছিলেন যে, তাঁদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দিনটিতে আগামী প্রজন্ম কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলফি দেবে আর ‘নেটফ্লিক্স’-এ ডুবে থাকবে? আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক ঠিকই, কিন্তু আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? মননে, চিন্তায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কি আজও পরাধীনতার অদৃশ্য শিকল জড়িয়ে নেই?

তবে কি বদলাতে হবে উদযাপনের ভাষা?
না, সপ্তাহান্তের ছুটি উপভোগ করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু ছুটির আমেজে গা ভাসাতে গিয়ে এই দিনটির অন্তর্নিহিত অর্থ আর ইতিহাসকে ভুলে যাওয়াটা বোধহয় এক প্রকার জাতীয় অপরাধ। ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস কেবল পতাকা তোলার দিন নয়, এটি আত্মবিশ্লেষণের দিন। নিজের দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেটাকে ফিরে দেখার দিন।আজ যে স্বাধীনতা আমরা বিনামূল্যে ভোগ করছি, তার দাম চোকাতে হয়েছিল অসংখ্য বেনামী শহীদ আর ভিটেহারা মানুষদের। তাই, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা দেশপ্রেমের স্ট্যাটাস দেওয়া বা শুধু জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন – নৌযুদ্ধ থেকে লালকেল্লার প্রাঙ্গণ! তেরঙ্গাকে সম্মান জানাতে কেন দেওয়া হয় ‘২১ গান স্যালুট’?
তাই আসুন, আজকের দিনে শুধু ছুটির আনন্দে মেতে না থেকে, একটু সময় দিই সেই সব শহীদদের স্মরণে, সেই সব ছিন্নমূল মানুষদের যন্ত্রণাকে অনুভব করতে। আজ আমরা একসাথে স্মরণ করি যে স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীনতার শিকল ছেঁড়া নয়, স্বাধীনতা মানে চিন্তার মুক্তি, নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়ার দায়বদ্ধতা। আসুন, এমন এক ভারত গড়ার শপথ নিই যেখানে স্বাধীনতা কেবল একটি দিনের উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, মানসিকতা এবং দায়িত্ববোধে প্রতিফলিত হবে। কারণ, স্বাধীনতা যদি শুধু ক্যালেন্ডারের লাল দাগ আর ছুটির দিন হয়েই থেকে যায়, তবে সেই স্বাধীনতার চেয়ে বড় পরাধীনতা আর কিছু হতে পারে না!



