এসপ্ল্যানেডে দাঁড়িয়ে আছেন; চারপাশে ব্যস্ত শহর, মেট্রো ছুটছে, রাস্তা দিয়ে মানুষ ছুটছে- অথচ এই চেনা কলকাতার বুকেই একসময় এমন কয়েকটা সিনেমাহল (cinema hall) ছিল, যেখানে ঢুকলেই অন্য এক জগত। হাতে টিকিট, হলের সামনে লম্বা লাইন, বিশাল পোস্টার আর সিনেমার বেস্ট সিন দেখে দর্শকের উচ্ছ্বাস , টিকিট না পেলে গেট ভাঙচুর। আজকের ঝকঝকে মাল্টিপ্লেক্সের শহরে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাক লাগতে পারে, এই কলকাতাতেই ছিল এমন কিছু হল, যাদের ইতিহাস একশো বছরেরও বেশি পুরনো।
সবচেয়ে পুরনো গ্লোব (cinema hall)। আজকের গ্লোবের জায়গায় ১৮২৭ সালে তৈরি হয়েছিল একটি অপেরা হাউস। পরে মালিকানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটির চেহারা ও নামও বদলায়। বিংশ শতকের গোড়ায় এটি সিনেমা প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ‘Globe Cinema’ নামে কলকাতার অন্যতম পরিচিত হল হয়ে ওঠে। ইংরেজি ছবি দেখানোর জন্যও একসময় এর যথেষ্ট নাম ছিল। বহু বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালে নতুন রূপে আবার সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা শুরু হয়।

১৮৮৩ সালে বউবাজারের কাছে বিডন স্ট্রিটে তৈরি হয়েছিল স্টার থিয়েটার (cinema hall)। পরে সেটি কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে, অর্থাৎ বর্তমান বিধান সরণিতে চলে আসে। এই স্টার থিয়েটার বাংলা বাণিজ্যিক থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল। সিনেমা হল তৈরি হওয়ার আগেই কলকাতার থিয়েটার মঞ্চ সিনেমার জন্য জায়গা করে দিয়েছিল। হীরালাল সেনের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সঙ্গেও এর নাম জড়িয়ে আছে । আগের ভবনটি পরে ভেঙে যায়; বর্তমান স্টার থিয়েটার সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছে।

১৯০৭ সালে তৈরি Elphinstone Picture Palace (cinema hall)-এ প্রায় ১,৭০০ দর্শকের বসার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। ১৯২৯ সালে স্থায়ী শব্দব্যবস্থাও চালু হয়। পরে নাম বদলে হয় মিনার্ভা, তারপর চ্যাপলিন। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে ভবনটির বেশিরভাগই ভেঙে ফেলা হয়।

আরও পড়ুন – দুর্ঘটনার থেকেও নীরব ঘাতক! যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় কাঁপছে দেশ, মুক্তির উপায় কী?
১৯০৮ সালে , চৌরঙ্গিতে তৈরি হয়েছিল Empire Theatre। পরে সেটিই হয়ে যায় Roxy Cinema (cinema hall)। প্রথমে ছিল অপেরা হাউস ও নাটকের মঞ্চ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এখানে বক্তৃতা ও অনুষ্ঠান করেছেন ;

Metro Cinema-র গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। ১৯৩৫ সালে এসপ্ল্যানেডে মেট্রো-র পথচলা শুরু। একসময় হলটির (cinema hall) নাম শুনলেই বড় বাজেটের ইংরেজি ও হিন্দি ছবির কথা মনে পড়ত। শহরের কেন্দ্রস্থলে তার অবস্থানও তাকে কলকাতার সিনেমা-সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক করে তুলেছিল। Gone with the Wind, Ben-Hur-এর মতো ছবি এখানে চলেছে; আবার ১৯৭৩ সালের Bobby টানা ৫২ সপ্তাহ চলেছিল বলে Bengal Film Archive-এর তথ্য। একসময় মেট্রো এতটাই শহরের অংশ হয়ে উঠেছিল যে পাশের রাস্তার নামই হয়ে যায় ‘মেট্রো গলি’।

তার পাশেই ছিল লাইটহাউস (cinema hall)। হলিউডের ছবি দেখানোর জন্য একসময় এটি ছিল কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় ঠিকানা। এই বিশাল হলটিতে একসময় প্রায় ১,৪০০ দর্শকের বসার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাইটহাউসের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই জায়গায় বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স তৈরি হয়।

১৯৩২ সালে শুরু হওয়া নিউ এম্পায়ার হলের (cinema hall) মঞ্চে সিনেমার পাশাপাশি নাটক, ব্যালে ও সংগীতানুষ্ঠান হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নটীর পূজাও এই মঞ্চে হয়েছিল। Yehudi Menuhin, Zubin Mehta, Uday Shankar—অনেক বিশিষ্ট শিল্পীর সঙ্গে এই জায়গার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৫০-এর দশক থেকে সিনেমা নিয়মিত জায়গা করে নেয় এবং পরে হলটি মূলত সিনেমা প্রদর্শনের জন্যই পরিচিত হয়।

আর দক্ষিণ কলকাতায় গেলে বসুশ্রী (cinema hall)-র কথা না বললেই নয়। ১৯৪৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর উদ্বোধন হওয়া এই সিঙ্গল-স্ক্রিন হলের সঙ্গে বাংলা সিনেমার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত জড়িয়ে আছে। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট এখানেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী-র প্রিমিয়ার হয়েছিল।
আরও পড়ুন – CAG রিপোর্টে রেলস্টেশনে জলও অনিরাপদ, নেই ন্যূনতম পরিষেবা!
এই হলগুলির অনেকগুলিই আজ আর আগের মতো নেই। কেউ বন্ধ, কেউ বদলে গিয়েছে, কেউ আবার নতুন রূপে ফিরেছে। কিন্তু কলকাতার মানুষের কাছে এরা শুধুই ইট-কাঠের ভবন নয়। এরা সেই সময়ের সাক্ষী, যখন সিনেমা দেখতে যাওয়া মানেই ছিল সাজগোজ করে বেরোনো, টিকিটটা যত্ন করে রেখে দেওয়া আর বাড়ি ফিরে ছবির গল্প নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা।



