দীর্ঘায়ু অভ্যাস (Longevity Habits) গড়ে তোলার কথা ভাবলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জিমে ঘাম ঝরানো, কড়া ডায়েট মেনে চলা কিংবা রোজ সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম থেকে ওঠার মতো কঠিন সব নিয়ম। অথচ দীর্ঘকাল সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচার আসল জাদুকঠি হয়তো শুধুই আপনার ডায়েট চার্ট বা শারীরিক কসরতে নয়, লুকিয়ে আছে খোদ আপনার আচরণ ও ব্যক্তিত্বের মাঝে। কঠোর কোনো নিয়ম ছাড়াই দৈনন্দিন স্বভাবের সামান্য কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে শতায়ু হওয়ার পথ সুগম করা সম্ভব, তাই উঠে এসেছে কয়েক দশকের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায়।
শুনতে অবাক লাগলেও, মনোবিজ্ঞানীদের কয়েক দশকের নিরলস গবেষণা ঠিক এমনটাই দাবি করছে। আপনার রোজকার অভ্যাস, আপনি কীভাবে চারপাশের মানুষের সঙ্গে মিশছেন বা কঠিন পরিস্থিতিতে আপনি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন—এই সবকিছুই আপনার আয়ু নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। ২০১৫ সালে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি ৭৫ বছর দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এসেছে এমন কিছু চমকপ্রদ তথ্য।
গবেষক জোশুয়া জে. জ্যাকসন (Joshua J. Jackson)-এর নেতৃত্বে প্রায় ৬০০ মানুষের ওপর পরিচালিত এই মেগা-স্টাডি জানাচ্ছে, মূলত ৫টি বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্য যাদের মধ্যে থাকে, তাদের দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি। চলুন জেনে নিই সেই ৫টি জাদুকরী গুণ সম্পর্কে:
১. দায়িত্ববোধ: দীর্ঘায়ুর প্রথম শর্ত
আপনার বন্ধুদের আড্ডায় আপনিই কি সবচেয়ে গোছানো আর সতর্ক মানুষটি? তাহলে আপনার জন্য সুখবর! গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কাজের প্রতি যত্নবান, নিয়ম মেনে চলেন এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে পা ফেলেন, তারা অন্যদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচেন। কারণ, দায়িত্বশীল মানুষেরা অযথা জীবনের ঝুঁকি নেন না, তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হন এবং যেকোনো বদভ্যাস থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন: সবসময় ফোন Silent? কী বলছে আপনার স্বভাব?
২. নতুনের প্রতি অদম্য আগ্রহ
বয়স বাড়লেই শেখার পালা চুকে যায় না। যারা মুক্তমনা, যারা নতুন ধারণা, নতুন অভিজ্ঞতা বা নতুন কোনো শখকে সহজেই আপন করে নিতে পারেন, তাদের মস্তিষ্ক সহজে বুড়িয়ে যায় না। নতুন কিছু শেখার এই আগ্রহ মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে সচল রাখে, সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং মানসিক অবসাদ দূর করে। ফলে বার্ধক্য সহজে থাবা বসাতে পারে না।
৩. বরফের মতো শান্ত মন
জীবনে ঝড়-ঝাপটা আসবেই, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি কি কথায় কথায় মেজাজ হারান নাকি শান্ত থেকে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন? বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘায়ুর পেছনে ‘মানসিক স্থিতিশীলতা’-কে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। যারা কঠিন সময়েও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
৪. হাসিখুশি ও মিশুকে স্বভাব
গোমড়ামুখো মানুষদের চেয়ে যারা প্রাণখুলে হাসতে পারেন এবং সবার সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারেন, তাদের আয়ু তুলনামূলক বেশি। শতবর্ষী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ওপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের বেশিরভাগই অত্যন্ত সামাজিক, পরোপকারী এবং বন্ধুবৎসল। ভালো সামাজিক সম্পর্ক আমাদের শরীরে ‘ফিল-গুড’ হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়, যা শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখে।
৫. মনের দরজা খোলা রাখা
রাগ, দুঃখ, অভিমান বা আনন্দ—বুকের ভেতর চেপে রাখার অভ্যাস কি আপনার আছে? যদি থাকে, তবে আজই তা বদলান। গবেষণা বলছে, যারা নিজেদের অনুভূতিগুলো কাছের মানুষদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন এবং আবেগ প্রকাশে কোনো সংকোচ করেন না, তারা মানসিক চাপমুক্ত থাকেন। মনের বোঝা হালকা হলে শরীরের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আরও পড়ুন: ডিম ফ্রিজে, না বাইরে? আসল নিয়ম জানুন
ভাবছেন, আপনার তো এই সবগুলো গুণ নেই? চিন্তার কোনো কারণ নেই! ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি জন্মগত নয়। একটু চেষ্টা, সঠিক পরিবেশ আর পজিটিভ চিন্তাভাবনার মাধ্যমে যে কেউ নিজের মধ্যে এই গুণগুলো গড়ে তুলতে পারেন। তাই আজ থেকেই কেবল শরীরের নয়, যত্ন নিন আপনার সুন্দর মন আর ব্যক্তিত্বেরও। কে বলতে পারে, হয়তো শতায়ু হওয়ার পথে আপনিই হবেন পরবর্তী উদাহরণ!



