কখনও কি এমন হয়েছে, রাত ২টো বেজে গেছে, অথচ মাথার ভেতর একই চিন্তা(Overthinking & Hypertension ) বারবার ঘুরছে? একই প্রশ্ন—”যদি এমন হয়?”, “আমি কি ভুল করলাম?”, “ভবিষ্যতে কী হবে?” একটা মেসেজের উত্তর, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কিংবা অন্যের মতামত—সব মিলিয়ে কেমন যেন পাগল বলে মনে হচ্ছে নিজেকে! একসময় ঘুম কমছে, রক্তচাপ বাড়ছে, আর জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আনন্দ। প্রশ্ন হল, ওভারথিঙ্কিং আর হাইপারটেনশন কি সত্যিই মানুষকে বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর—হ্যাঁ, পারে। যদিও ওভারথিঙ্কিং নিজে কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের রোগের নাম নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে এটি উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্ণতা (Depression), অনিদ্রা, এমনকি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। আশ্চর্যের বিষয়, এই সমস্যায় আজ সবচেয়ে বেশি ভুগছে জেন জি (Gen Z)-এর বড় একটা অংশ।
কেন ওভারথিঙ্কিং এত বিপজ্জনক?
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ওভারথিঙ্কিং হল এমন এক মানসিক অভ্যাস যেখানে একজন মানুষ একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকেন, কিন্তু কোনও সমাধানে পৌঁছতে পারেন না। এটিকে অনেক সময় রুমিনেশন (Rumination) বলা হয়।
যখন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে দুশ্চিন্তা করি, তখন শরীর “স্ট্রেস মোড“-এ চলে যায়। এই অবস্থায় শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল (Cortisol) ও অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline)-এর মাত্রা বাড়তে পারে। স্ট্রেসের সময় শরীরের “ফাইট অর ফ্লাইট” মোড সক্রিয় হয়, ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়ে, পেশিতে টান ধরে, মাথাব্যথা – ক্লান্তি বাড়তে থাকে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হজমের সমস্যা হতে পারে।

বারবার এমন হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। চিকিৎসকদের মতে, বারবার এমন স্ট্রেস (Overthinking & Hypertension) চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি অনেকেই স্ট্রেস সামলাতে অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া, ধূমপান, মদ্যপান, কম ঘুম বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েন। এগুলিও উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জেন জি-দের মধ্যে সমস্যা কেন বেশি?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে জেন জি এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে যেখানে সবকিছুই দ্রুত বদলাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের “পারফেক্ট” জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করা, পড়াশোনা ও চাকরির চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকীত্ব এবং বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন সারাক্ষণ একটা দৌড় (Overthinking & Hypertension) চলতে থাকে।
আরও পড়ুন – সাপলুডো শুধু খেলা নয়, জীবনের পাঠও বটে!
তার উপর মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন, রাত জেগে স্ক্রিন দেখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব মস্তিষ্ককে কখনও পুরোপুরি শান্ত হতে দেয় না। ফলে ছোট সমস্যা থেকেও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়।
ওভারথিঙ্কিং কি ডিপ্রেশনের কারণ?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার। ওভারথিঙ্কিং (Overthinking) মানেই ডিপ্রেশন (Hypertension) নয়। আবার ডিপ্রেশনও শুধু অতিরিক্ত ভাবনার কারণে হয় না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার করা উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং যাঁদের আগে থেকেই ডিপ্রেশন রয়েছে, তাঁদের উপসর্গ আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
একই বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবা, ঘুম না হওয়া বা মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, অকারণে বুক ধড়ফড় করা, সব সময় খারাপ কিছু ঘটবে বলে মনে হওয়া, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, বিরক্তি ও ক্লান্তি বেড়ে যাওয়া, বারবার মাথাব্যথা বা শরীরে অস্বস্তি অনুভব করা।
এই লক্ষণগুলি দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে মনোবিদের কাউন্সেলিং বা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত থেরাপি, যেমন কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়াম, প্রতিদিন ৭–৯ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম, সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় সীমিত রাখা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন, ক্যাফেইন ও অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার কম খাওয়া, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খাওয়া, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেওয়া।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা বা ইন্টারনেট দেখে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কারণ একই ধরনের লক্ষণের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
শেষ কথা
ওভারথিঙ্কিংকে অনেকেই “স্বাভাবিক অভ্যাস” বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু যখন এই অভ্যাস দিনের পর দিন ঘুম কেড়ে নেয়, মন খারাপ বাড়ায়, কাজের ক্ষতি করে বা শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একইভাবে, হাইপারটেনশনও এমন একটি রোগ যা অনেক সময় কোনও লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ক্ষতি করতে পারে।
আরও পড়ুন – বয়স নয়, রাতে বালিশই বাড়িয়ে দিচ্ছে বলিরেখা! জানলে আজই বদলাবেন ঘুমের ভঙ্গি
তাই চিন্তা নয়, সচেতনতা হোক প্রথম পদক্ষেপ। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত ভাবনা (Overthinking & Hypertension) কোনও সমস্যার সমাধান নয়; বরং সঠিক সময়ে সঠিক সাহায্য নেওয়াই প্রকৃত শক্তির পরিচয়।



