ছোটবেলায় সাপলুডো (Snake & Ladder Ludo) খেলেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। পাশা ফেললাম, ঘুঁটি এগোল, সিঁড়ি পেলে এক লাফে উপরে উঠে গেলাম, আবার সাপের মুখে পড়ে নেমে এলাম নিচে—খেলাটা এতটাই সহজ যে মনে হয়, এটি শুধুই শিশুদের বিনোদনের জন্য তৈরি। কিন্তু জানতেন কি, সেই খেলাই একসময় ছিল জীবনের পাঠ শেখানোর মাধ্যম? এই জনপ্রিয় খেলাটির শিকড় লুকিয়ে আছে কয়েকশো বছরের পুরনো ভারতীয় দর্শনে।
আজকের সাপলুডোর (Snake & Ladder Ludo) কথা বলতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা সাধারণত ভারতের প্রাচীন নৈতিক শিক্ষামূলক খেলা মোক্ষ পটম (Moksha Patam)-এর কথা বলেন। এটাকে জ্ঞান চৌপারও বলে। যদিও এই খেলার সঠিক জন্মকাল বা কোনও নির্দিষ্ট আবিষ্কারকের নাম পাওয়া যায় না, গবেষকদের মতে মধ্যযুগীয় ভারতে এই ধরনের খেলার বিকাশ ঘটে। সেই সময় ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে এমন প্রতীকী খেলার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে সেই গভীর বার্তাই আজ হারিয়ে গেছে আধুনিক সাপলুডোর রঙিন বোর্ডে।

মোক্ষ পটম নামের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল খেলার আসল অর্থ। ‘মোক্ষ’ অর্থ জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি এবং ‘পটম’ অর্থ বোর্ড বা চিত্র। অর্থাৎ পুরো বোর্ডটিই ছিল মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রথম ঘর ছিল জন্মের প্রতীক, আর শেষ ঘরে পৌঁছনো মানে ছিল আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়া।
আরও পড়ুন – সিমলার বুকে লুকিয়ে কোন চমক?
প্রতিটি ঘর বলত জীবনের গল্প
আজকের সাপলুডোতে (Snake & Ladder Ludo) শুধু সংখ্যা দেখা যায়। কিন্তু প্রাচীন মোক্ষ পটমে প্রতিটি ঘরের সঙ্গে যুক্ত থাকত বিশেষ অর্থ। কোনও ঘরে লেখা থাকত সত্য, দয়া, ভক্তি, জ্ঞান, বিনয় বা আত্মসংযমের মতো গুণ। আবার অন্য ঘরে থাকত লোভ, অহংকার, ক্রোধ, মিথ্যা, ঈর্ষা কিংবা মোহের মতো মানুষের দুর্বলতা। খেলোয়াড় যখন বোর্ডে এগিয়ে যেতেন, সেটি শুধু জয় পাওয়ার পথ ছিল না। এটি বোঝাত—জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, আর ভুল পথ তাকে পিছিয়ে দেয়।
সাপ আর সিঁড়ির আসল রহস্য
সাপলুডোর (Snake & Ladder Ludo)সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল সাপ ও সিঁড়ি। কিন্তু এগুলিও ছিল প্রতীকী। সিঁড়ি বোঝাত মানুষের ভালো গুণ ও সৎ কাজ। সত্যবাদিতা, দান, ধৈর্য, ভক্তি ও করুণা মানুষকে জীবনের উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেয়—যেমন সিঁড়ি দ্রুত উপরে তুলে দেয়।
অন্যদিকে সাপ ছিল মানুষের নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতীক। লোভ, রাগ, অহংকার, প্রতারণা বা অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা মানুষকে উন্নতির পথ থেকে সরিয়ে আবার নিচে নামিয়ে দেয়। এই কারণেই অনেক প্রাচীন বোর্ডে দেখা যেত, সাপের সংখ্যা সিঁড়ির তুলনায় বেশি। এর মাধ্যমে বোঝানো হতো—সৎ পথে থাকা কঠিন, কিন্তু ভুল পথে পা বাড়ানো খুব সহজ।
একই খেলা, বিভিন্ন সংস্করণ
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মোক্ষ পটমের একাধিক রূপ তৈরি হয়েছিল। হিন্দু দর্শনের সংস্করণে ধর্ম, কর্ম, জ্ঞান ও মোক্ষের ধারণা গুরুত্ব পেত। আবার জৈন সম্প্রদায়ের সংস্করণে অহিংসা, ত্যাগ ও আত্মসংযমের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হতো। দক্ষিণ ভারতে এই খেলার একটি জনপ্রিয় রূপ ছিল ‘বৈকুণ্ঠপালি’ বা ‘পরমপদম’, যেখানে শেষ ঘরকে ভগবান বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠধামের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। এখনও দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলে এই ঐতিহ্যের স্মৃতি দেখা যায়।
ভারত থেকে ব্রিটেনে, তারপর বিশ্বজুড়ে
উনিশ শতকে ব্রিটিশরা ভারতে এই খেলার সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরে এটি ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। তবে ব্রিটিশ সংস্করণে ধীরে ধীরে বদলে যায় খেলার মূল দর্শন। কর্মফল, মোক্ষ, পুনর্জন্মের মতো ভারতীয় ধারণার পরিবর্তে সেখানে যুক্ত হয় ভিক্টোরীয় সমাজের নৈতিক শিক্ষা।
সিঁড়ি হয়ে ওঠে পরিশ্রম, সততা ও ভালো আচরণের পুরস্কারের প্রতীক। আর সাপ বোঝাতে শুরু করে অলসতা, খারাপ অভ্যাস বা ভুল সিদ্ধান্তের ফল।
পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে আমেরিকায় খেলাটি নতুন রূপ পায়। খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিল্টন ব্র্যাডলি এটিকে ‘Chutes and Ladders’ নামে প্রকাশ করে। সেখানে সাপের বদলে ব্যবহার করা হয় ঢাল বা চুটস। শিশুদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলতেই এই পরিবর্তন আনা হয়।
আজকের সাপলুডো আসলে কত পুরনো এক গল্প!
আজ আমরা সাপলুডো খেলি শুধুই আনন্দের জন্য। কিন্তু এই সাধারণ বোর্ডের প্রতিটি ঘরের পিছনে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন, সিদ্ধান্ত আর কর্মের এক গভীর দর্শন।
আরও পড়ুন – বড়দিনে মহাসংগ্রাম! ‘অ্যাভেঞ্জার্স’-কে টেক্কা দিতে প্রস্তুত বলিউডের ‘কিং’-খান
একটি পাশা, কিছু ঘর, কয়েকটি সাপ আর সিঁড়ি—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই প্রাচীন ভারত মানুষকে শিখিয়েছিল এক বড় সত্য: জীবনে এগিয়ে যাওয়া শুধু ভাগ্যের ওপর নয়, নিজের কাজ ও চরিত্রের ওপরও নির্ভর করে।



